খেলা

আজ বাংলাদেশের ইংল্যান্ড অভিযান

প্রেস বক্সের পেছনের ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে দূর পাহাড়ের মাথায় ঝুলে থাকা ছোট্ট বীর বিলিং গ্রাম। নামে গ্রাম, তবে এটি আবার রাজধানীও। বুঝতে সুবিধার জন্য বলে রাখি, ভারতের ‘প্যারাগ্লাইডিং ক্যাপিটাল’ হিসেবে এই গ্রামের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। সারা দিন দুঃসাহসীদের সেখান থেকে প্যারাশুট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য দূরের হলেও ঝাপসা নয়।

গত দু-এক দিনের আলোচনার হাওয়াটা এমন যে ইংল্যান্ড যেন আজকের বাংলাদেশ ম্যাচ ছাপিয়ে সে রকমই দুঃসাহসিক কোনো অভিযানে নেমে পড়ছে ধর্মশালার হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (এইচপিসিএ) স্টেডিয়ামে। যেখানে রোমাঞ্চের সঙ্গে আছে ভয় আর ঝুঁকিও। ইংল্যান্ড অধিনায়ক জস বাটলারের সংবাদ সম্মেলনে ব্রিটিশ সাংবাদিকদের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি প্রশ্ন এক বিষয় নিয়েই। অবশ্য ইংলিশ শিবিরের গতকালের অনুশীলনে চোখ রাখলে সাংবাদিকদের দোষ দেওয়ারও কিছু নেই।

বিশেষ করে একটা সময় পর্যন্ত তাদের ফাস্ট বোলারদের কেউই বোলিং করছিলেন না। কিন্তু মাঠের সেন্টার উইকেটে পুরো রানআপে দৌড়ে ঠিকই বোলিং ক্রিজ পর্যন্ত যাচ্ছিলেন তাঁরা। আলোচনা যেহেতু ছিল, তাই সেটিকে অন্য রকম এক প্রস্তুতির অংশ বলেই ধরে নেওয়া গেছে অবলীলায়। এইচপিসিএর বালুময় বাজে আউটফিল্ড ইংলিশদের মধ্যে এমন আতঙ্কই ছড়িয়েছে যে বোলিং করার আগে চলছিল পেসারদের চোটে পড়ার আশঙ্কা খতিয়ে দেখার অনুশীলন।

অনুশীলনে অবশ্য কেউ চোট-আঘাত পাননি। তবে নিউজিল্যান্ডের কাছে হার দিয়ে আসর শুরু করা ওয়ানডের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ভয় তাতেও কেটেছে বলে মনে হয়নি বাটলারের কথায়। না হলে সংবাদ সম্মেলনে কেন বলবেন যে, ‘হ্যাঁ, আউটফিল্ড নিয়ে উদ্বেগ আছে। মাঠে ডাইভ দিতে তাই সতর্ক হতে হবে। ফিল্ডিং করতে হবে একটু বুঝেশুনেই।’

তবে বাংলাদেশের সেই সমস্যা নেই। ধর্মশালায় তারা এরই মধ্যে একটি ম্যাচ খেলে ফেলেছে। খেলতে যখন হবেই, তখন আউটফিল্ড নিয়ে অভিযোগে সময় নষ্ট করার কোনো কারণ খুঁজে পাননি স্পিন বোলিং কোচ রঙ্গনা হেরাথ।

ফিল্ডিংয়ের সময় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সতর্কতা অবলম্বনের কথাও নাকি বলা হয়নি কাউকে, ‘আমরা কোনো বিধি-নিষেধ দিইনি। কারণ ওরকম কিছু বলা হলে ছেলেরা নিজেদের শতভাগ দেবে না।’ আফগানিস্তানকে হারিয়ে আসর শুরু করা বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টকে বরং ইংল্যান্ড ম্যাচের রণপরিকল্পনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। মাঠে এসেই সবার আগে একা একা এই ম্যাচের উইকেট দেখতে চলে এলেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। একটু পরেই টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট শ্রীধরন শ্রীরামকে নিয়ে ফিরলেন আবার। সেখানেই শেষ নয়। অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে নিয়েও একাধিকবার উইকেটের সামনে গিয়ে শলাপরামর্শ করতে দেখা গেল বাংলাদেশ দলের হেড কোচকে।

উইকেটের সামনে কোচের বারবারের উপস্থিতি থেকে আজকের একাদশ নিয়েও ধারণা মিলতে পারে। অফস্পিনিং অলরাউন্ডার শেখ মেহেদী হাসান একাধিকবার উইকেটের সামনে আলাপে ব্যস্ত থাকলেন কোচের সঙ্গে। আগের ম্যাচে একজন বাড়তি ব্যাটার নিয়ে খেলার কারণে বাংলাদেশ নামিয়েছিল পাঁচ বোলার। আফগানদের বিপক্ষে উইকেট কিছুটা স্পিন সহায়ক হওয়ায় সাকিব-মিরাজের জুটি প্রতিপক্ষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে। সেই ম্যাচে তাঁদের বোলিংকে ‘দশে দশ’ই দিলেন হেরাথ। তবে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং শক্তি অনেক বেশি হওয়ায় এবার বাংলাদেশের ছয় বিশেষজ্ঞ বোলার নামানোর ভাবনায় আছে ব্যাটিংও। লোয়ার অর্ডারে কিছু রানের আশায় তাই আজ মাহমুদ উল্লাহর জায়গায় একাদশে শেখ মেহেদীকে দেখার সম্ভাবনা প্রবল।

তিন পেসারের সঙ্গে তিন স্পিনার—একাদশ সাজানোয় বাংলাদেশের সম্ভাব্য এই রূপরেখা উইকেট আবারও স্পিন-সহায়ক হওয়ার ধারণাই দেয়। কিন্তু বাটলারের কথা শুনলে তা মনে হবে না একটুও, ‘উইকেট দেখলাম। মনে হচ্ছে, আগের ম্যাচের (বাংলাদেশ-আফগানিস্তান) চেয়ে ভিন্নতা আছে। পেস ও বাউন্স থাকবে।’ আইসিসির আয়োজনে উন্মুক্ত মিডিয়া সেশনে আসা ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক এউইন মরগানও নিশ্চিত যে ধর্মশালার উইকেট ইংলিশ ফাস্ট বোলারদের দিকেই হাত বাড়িয়ে রাখবে।

শেষ পর্যন্ত উইকেট যেমনই হোক না কেন, জেতার তাড়না থাকবে দুই দলেরই। বাটলার অবশ্য গত কয়েক দিনের আলোচনার সূত্র ধরে শুভ কামনা জানিয়ে রাখলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরও, ‘আশা করি, দুই দলের কেউই দুর্ভাগ্যজনক চোটের কবলে পড়বে না।’ পর পর দুই বিশ্বকাপে (২০১১ ও ২০১৫) বাংলাদেশের কবলে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার দুঃস্মৃতি আছে ইংল্যান্ডের। তারা ২০১৯ বিশ্বকাপ জেতার পরও বাংলাদেশ ম্যাচ এলেই ফিরে ফিরে আসে সেসব। পুরনো ইতিহাস যেহেতু আছেই, তাই এবারও বাংলাদেশ তাদের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে পাল্টা হুংকারই যেন ছেড়ে রাখলেন ইংলিশ অধিনায়ক, ‘না, একদমই না। বাংলাদেশের বিপক্ষে কিন্তু দারুণ কিছু ম্যাচও গেছে আমাদের।’ ২০১৯ বিশ্বকাপেই প্রায় চার শ (৩৮৬) রান তুলে বাংলাদেশ ম্যাচটি একতরফা বানিয়ে ছেড়েছিল ইংলিশরা।

এই ইংল্যান্ডকে হারানো তাই বাংলাদেশের জন্যও দুঃসাহসী অভিযানই। প্রেস বক্সের পেছনে দূর পাহাড়ের মাথায় ঝুলে থাকা বীর বিলিং গ্রামের প্যারাগ্লাইডিং পয়েন্ট থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension