অণুগল্পসাহিত্য

অণুগল্প: কফিন

ফারজিনা মালেক


মাত্র পাঁচ বছর হল বাপটা মারা গেছে। অথচ সকাল থেকে শানু কিছুতেই মনে করতে পারছে না তার বাবা কয়টার সময় মারা গেছে। বাবার মরা তো কতভাবেই ভোগায় মানুষেকে। আর শানুকে ভোগাচ্ছে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম একটা কারণ- মরার সময় টা মনে করতে না পারা।

সকাল সাড়ে নয়টায় নাইলে এগারটায় হবে। না না, সাড়ে নয়টায় কিভাবে হয়… সাড়ে নয়টায় তো তার বাচ্চাটা হলো; তার বাবা মরারও তিন বছর আগের কথা সেইটা। তাইলে কী এগারটায়? ধুত্তোরি, মনে নাই কেন?

২৮ অক্টোবর ২০১৩, এইটা মনে আছে। দিনাজপুরে ছিল সে; শ্বশুরবাড়িতে। সকালে নাস্তা শেষ করেছে। দুপুরে খালা শাশুড়ি আর কারা যেন আসবে, রান্নার তোড়জোড় চলছে। তখনই ফোনটা এসেছিল। শানুর ছোট বোন ফোন দিয়েছিল। শানু তখন রান্নাঘরে। তাই যখন ঘরে গিয়ে দেখল তখন মিসড্‌ কল। কলব্যাক করল; গোঙাতে গোঙাতে কীসব জানি বলল ওর বোন । শানু বুঝল না কিছুই ।

ভয়ে আশংকায় ফোন দিল তার মাকে। হাসপাতালের পাশের বেডের ভদ্রমহিলা ধরল। সে শানুকে অবাক কণ্ঠে খানিকটা ধমকের সুরে বলল, আপনারা জানতেন না? বুঝেন নাই? আপনি অতদুরে? কাছেটাছে থাকবেন না? শানু প্রথম কান্না শুরু করে ভদ্রমহিলার ঝাড়ির মতন এই প্রশ্নগুলা শুনে। বাবা মরার বিষয়টা তখন কানে ঢুকলেও বুঝে আসে না পুরাপুরি। যদিও ফোনটোনে সেই কথা বলছিল, কিন্তু তার শাশুড়ি, নোনাস ওনারাই যাওয়ার জোগাড়যন্ত্র করল।

লাগাতার হরতাল সেই সময়। বিএনপি-জামাত তখন মরণ কামড় দিয়েছে। মোটর সাইকেল, ট্রলার, সিএনজি, রিকশা নানান কিছু দিয়ে শানু জামালপুরে তার দাদুবাড়িতে পৌঁছালো রাতের বেলা। তার বাপটারও অনেক ঝামেলা হয়েছিল তার বাপের বাড়িতে আসতে। হাসপাতালের একশ নিয়ম; ডেথ সার্টিফিকেট নেও, বিল মিটাও, অল্প কয়দিনের এক বেডের সংসার গুছাও। এই করেটরে মিছিলের পর মিছিল পাড়ি দিয়ে এ্যাম্বুলেন্সে করে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর অব্দি আসতে আসতে তারও বেলা পার হয়ে গেছিল।

বাবাটাকে শোয়ানো হয়েছিল ভিতর বাড়ির উঠানে। শানু যেতে যেতে একদফা কান্নাকাটি শেষ। সে যাওয়াতে আরও এক দফা শুরু হলো। সরবান বু তাকে জড়ায়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করল। শানু সেইদিন দ্বিতীয়বারের মতো আবার কাঁদল, সরবান বু’র কান্নার দমকে সংক্রমিত হয়ে। যে শানু খুব ছোট ছোট বিষয়ে কাঁদে, সেই মেয়ে বেকুবের মতো বসে আছে; তার কান্না আসছে না। কেন যে কান্না আসছিল না- এইটা তাকে খুব ভোগাচ্ছিল।

এই ভোগান্তিসহ সে বিহ্বলের মতো একবার উঠানে বাপের কাছে যায়, একবার ঘরে মায়ের কাছে যায়। কী করবে বুঝতে পারে না। কান্না না করতে পারাটা খুব ভোগায় তাকে। মনে হয় কী একটা কর্তব্য পালন করতে পারছে না। তাই তখন মনে হলো, সারা রাত বাবার কফিনের পাশে বসে থাক বরং। কোনও একটা কর্তব্য না হয় পালন করা হবে তাতে। সেটাও করতে পারে না আসলে। এর মধ্যে দুই তিন ঘন্টা ঘুমায়েও নেয় সে।

সকালে আবার মরা বাড়ি জমজমাট হলো। আবার দলে দলে লোক আসল দেখতে। আবার শানুকে জড়ায়ে ধরে কারা কারা যেন কাঁদল। শানু তখনও বেকুবের মতো এদিক ওদিক করছে। একবার বাপের কফিনের একদিকে যায় আরেকবার ঐদিকে যায়। এরকম দিকবিদিক করতে করতেই পিঁপড়ার ছোট একটা লাইন চোখে পড়ল। পুরা একদিনের মরা মানুষটা এখন ধীরে ধীরে খাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠছে। কফিনের ভিতর দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে ঢুকছে তারা। এই প্রথম শানুকে কিছু একটা ঝাঁকি দিয়া গেল।

মরার সময় মনে করতে না পারা, অন্যের চোখের পানি আর এক সারি পিঁপড়ার দল- শানু বুঝতে পারে না এই তুচ্ছ বিষয়গুলা তাকে এত কাঁদায় কেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension