আন্তর্জাতিকইউরোপএশিয়া

চীনের সূত্র শত্রুর শত্রু মিত্র

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে তাদের দুই দেশের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনে তারা পরস্পরকে সহায়তার অঙ্গীকার করেছেন। গত বুধবার পিয়ংইয়ং সফরকালে কিমের সঙ্গে বৈঠকের পর এ ঘোষণা দিয়েছেন পুতিন। অন্যদিকে কিম বলেছেন, এটি তাদের সম্পর্ককে একটি নতুন, সহযোগিতার ‘অনন্য মাত্রা’ দিয়েছে। চুক্তিটি তাদের দ্রুত ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্পর্ককে আরও জমাট বাঁধাবে বলে পশ্চিমাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো দুই নেতাই অনুভব করেছেন যে তাদের পরস্পরকে প্রয়োজন। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পুতিনের দরকার গোলাবারুদ আর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা উত্তর কোরিয়ার দরকার অর্থ। তবে দুই নেতার পারস্পরিক এই কাছে আসার পেছনে ভূমিকা আছে চীনেরও। চীন যদিও রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার উদীয়মান সম্পর্ককে খুব একটা ভালো নজরে দেখছে বলেই ধরে নেওয়ায় যায়। তবে এটা আরও বেশি সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর বিরুদ্ধে সরব ও সোচ্চার পুতিন ও কিম চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের খুব দূরের কেউও নন। তাদের তিনি মিত্র হিসেবেই বিবেচনা করেন। এই দুই দেশ থেকে চীনের প্রত্যক্ষ লাভ-লোকসানের হিসাব যাই হোক তারাও পশ্চিমাদের শত্রু বলেই চীনের মিত্র। সেই হিসেবে অনেকে অনেক কথা বললেও, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ার নাকের ডগায় বসে নতুন বন্ধুত্বকে ঢাকঢোল পিটিয়ে হাজির করাকে চীনের আশকারা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

বিবিসি বলছে, পূর্ব এশিয়ায় প্রকৃত শক্তি পিয়ংইয়ং নয়; এবং তারা তা হতেও চায়নি। কিন্তু রাশিয়া আর উত্তর কোরিয়া দুই দেশের এই নতুন করে যে বন্ধনের সূত্রপাত তা কৌশলগত কারণেও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এটি ছিল চীনের দরজায় এবং বেইজিংয়ের জন্য যাতে উসকানি না হয় সে আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়েছে দুই দেশকে। বেইজিং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় থাকা উভয় দেশের জন্য বাণিজ্য ও প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যদিও পুতিন ‘প্রগাঢ় বন্ধুত্বের’ জন্য কিমের প্রশংসা করেছেন কিন্তু তিনি অবশ্যই জানেন তারও একটি সীমা আছে। আর সেই সীমাটি হলো চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

এরই মধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা গেছে যে শি তার দুই সহযোগী দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সখ্যে খুব একটা সন্তুষ্ট নন। গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বৈঠকের পর পুতিনকে পিয়ংইয়ং সফরে না যেতে সরাসরিই বলেছিল বেইজিং।

এর একটা কারণ শি মস্কোকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে এবং ইউক্রেন য্ুেদ্ধ সহায়তা হয় এমন কিছু বিক্রি না করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চাপের মধ্যে আছেন।

তিনি এসব সতর্কতা পুরোপুরি উপেক্ষাও করতে পারেন না। এটা শুধু এজন্য নয় যে বিশ্বকে চীনা বাজারের প্রয়োজন। বরং বেইজিংয়ের বিদেশি পর্যটক এবং বিনিয়োগও দরকার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য।

চীন এখন ইউরোপের একাংশ, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা দিচ্ছে। দেশটির পান্ডা আবারও বিদেশের চিড়িয়াখানায় ছাড়া হচ্ছে।

বিবিসি বলছে, চীনের উচ্চাভিলাষী নেতা বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও বড় ভূমিকা রাখতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে চান। তিনি নতুন করে পশ্চিমা চাপ আর চাইবেন না। একই সঙ্গে তিনি মস্কোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখবেন।

যদিও তিনি ইউক্রেনে আগ্রাসনের নিন্দা করেননি কিন্তু তিনি রাশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক সহায়তাও দিতে পারেননি।

সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র এগিয়ে নিতে কিমের চেষ্টাকে একটি রাজনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে চীন বারবার জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়ে।

তবে শি কিম জং উনের অন্ধ ভক্ত নন। তারপরও বেইজিংয়ের অননুমোদন হয়তো উত্তর কোরিয়ায় রাশিয়ান সামরিক প্রযুক্তির বিক্রি বাড়িয়ে দিতে পারে। সেটাও যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এনকে নিউজের পরিচালক আন্দ্রেই ল্যাংকভ বলেছেন, আমি মনে করি না রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে বিশাল পরিমাণে কোনো সামরিক প্রযুক্তি দেবে। সেটি করলে রাশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও উত্তর কোরিয়ার গোলাবারুদ পুতিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তা করবে, তবে এর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিনিময় তার জন্য ভালো চুক্তি হবে না।

এছাড়া পুতিন হয়তো উপলব্ধি করবেন যে চীনকে বিরক্ত করার জন্য এটা যথেষ্ট কিছু হবে না। দেশটি রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কিনছে যখন বিশ্বে এখন সে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।

পিয়ংইয়ংয়ের চীনকে দরকার আরও বেশি। এটি একমাত্র দেশ যেখানে কিম সফর করেছেন। উত্তর কোরিয়ার এক-চতুর্থাংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত তেল আসে রাশিয়া থেকে কিন্তু ৮০ ভাগ ব্যবসাই চীনের সঙ্গে। পুতিন এবং কিম নিজেদের সহযোগী হিসেবে দেখালেও চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা সত্ত্বেও, এটা একটি যুদ্ধকালীন অংশীদারিত্ব। এটি আরও অগ্রসর হতে পারে, কিন্তু এখন সেটা অনেকটাই লেনদেনভিত্তিক, এমনকি তাদের অংশীদারিত্বের মাত্রা বাড়লেও।

দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সত্ত্বেও পিয়ংইয়ং গোলাবারুদ সরবরাহ অব্যাহত রাখবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশ্লেষকরাও মনে করেন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া ভিন্ন ধরনের অপারেটিং সিস্টেমে কাজ করে।

উত্তর কোরিয়ার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো দেশ দুটি কয়েক দশক ধরে তাদের সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়নি। যখন পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল তখন পুতিন দুবার পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন এবং উত্তর কোরিয়া যাতে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন।

তবে কিম ২০১৮ সালের কূটনৈতিকভাবে প্রবল চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন তখন তিনি একবার ভøাদির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তারপর কিমের চওড়া হাসি, আলিঙ্গন ও হাত মেলানো ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। তারা তিনবার পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি কথিত প্রেমপত্র বিনিময় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। পরে তাদের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে।

অন্যদিকে শি ছিলেন তার জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক নেতা, যার সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছিলেন। সুতরাং বন্ধু তালিকায় পুতিন নতুন।

তারপরও তারা দুজনই চীনের সাহায্যপ্রার্থী এবং চীনকে ছাড়া তাদের শাসন সংকটে পড়বে। ফলে উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বিষয়ে চীনের ভূমিকা থাকবেই সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension