মুক্তমত

না হয় নতুন করেই আবার শুরু হোক

শাহ্‌ জে. চৌধুরী


২০২২ বছরটি শেষ হয়ে গেল। আচ্ছা ২০২২ সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কোনটি? কিংবা কিসব ঘটনা ঘটেছে ২০২২-এ? প্রবৃদ্ধির গতি হ্রাস পাওয়ার বছর? দারিদ্র্য বিমোচন থমকে যাওয়ার বছর? কিংবা ঋণের বোঝা বাড়তে থাকার বছর? বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ১৯৭০-এর দশকের সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতি এখন সবচেয়ে সংকটের মধ্যে আছে। কোভিড-১৯ ফিরে আসার বছর? চীনে রোজ দশ লাখ মানুষ কোভিডে সংক্রমিত হচ্ছে। অথবা বলতে পারেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বছর। পাকিস্তানে অতিবন্যায় শত শত মানুষ মারা গেছে, চীন ও হর্ন অব আফ্রিকায় খরার কারণে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ইউরোপও ৫০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক খরার সম্মুখীন এখন। জলবায়ু পরিবর্তনের বছরও বটে। আরও বলা যায় জ্বালানিসংকটের বছর বা শিক্ষার ক্ষতির বছর? নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ১০ জন বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। তাদের মধ্যে ৪৭ জন মহামারির আগে শিক্ষা বঞ্চিত হয়েছে।

নাকি যুদ্ধের বছর? হ্যাঁ যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। আর? আর এই মুহূর্তে আমার যেটি মনে পড়ছে সেটি আমেরিকার শীত। এবারের শীতকালটা আমাদের কাছে এবার ভয়াবহ এক রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে।

তো বছরের এ সময়টা তো শীতকালেরই। প্রাচ্যের দেশগুলোতে তুষার ঝরে না, কুয়াশা ঝরে। আমেরিকায় তুষার ঝরে। আর ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস হওয়ার কারণে ক্রিসমাসের সঙ্গে স্নো-ফলের একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে আছে। ব্যাপারটা এমন যে, ক্রিসমাসে যদি তুষার না ঝরে তাহলে ক্রিসমাসের আনন্দ তো এদেশে একেবারেই জমে না। কি যেন নেই নেই লাগে। আবার বছরের প্রথম তুষারপাত ক্রিসমাসের দিনটিতেই ঝরেছে- এমন নজিরও আছে। হয়ত সেকারণেই এদেশে অনেকেই ক্রিসমাসের দিনটিকেই বছরের প্রথম স্নো-ফলের দিন হিসেবে বিবেচনা করেন। যদিও তাদের এমন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এ বছর তুষারপাত শুরু হয়েছে ক্রিসমাসের বেশ আগে থেকেই। তুষারপাত এসেই ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ে রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালে ইতিহাসের শীতলতম ক্রিসমাস ইভ কাটালো যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। খবরের কাগজগুলো লিখেছে আমেরিকা এখন ডিপফ্রিজ হয়ে গেছে। আজ সকালেই ঠাণ্ডায় জমে আমার বাড়ির পানির পাইপ ফেটে গেছে। মিস্ত্রি ডেকে এনে ঠিক করাতে হয়েছে। আমেরিকার রাস্তায় পুরু বরফের আস্তরণ। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫০ ডিগ্রি নিচে নেমে গেছে। মাইনাস ৫০ ডিগ্রি হলো, আপনি পানি গরম করে আকাশে ছুঁড়ে দিলেন, সে পানি তুষার হয়ে ঝরতে লাগল। এ লেখাটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত আমেরিকায় ৫০ জন মানুষ শীতে জমে মরে গেছে।

একটা সময় ছিল যখন পশ্চিমে শীতকাল এলে মানুষের জীবন স্থবির হয়ে যেত। শীতকালের প্রস্তুতি এদেশের মানুষ কয়েক মাস আগে থেকেই নিতে শুরু করত। ঘরবাড়িগুলোকে সাধ্যমতো বাতাস নিরোধক করতে চেষ্টা করত। ফায়ারপ্লেস, চিমনি ইত্যাদি ঠিকঠাক করে ফেলত। এবং পুরো শীতকাল যেন ফায়ারপ্লেস জ্বলতে পারে তার জন্যে গাছ কেটে পর্যাপ্ত কাঠ সংগ্রহ করে রাখত।

অনেক পুরনো একটা গল্প আছে। স্যামের স্ত্রী একবার বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে অনেকদূরে বাবার বাড়িতে গেল বেড়াতে। কিন্তু স্যামের কোনো ভাবনার নাই। ঘরে প্রচুর খাবার মজুদ করা আছে। সে বছর প্রচণ্ড শীত পড়ল। কিন্তু ভয়ের কিছু নাই, ফায়ার প্লেসের জন্য যথেষ্ট কাঠ জোগাড় করে রাখা আছে। ঘরের কাঠ ফুরালে বাইরের প্রচুর কাঠ কেটে এনে রাখা আছে। স্যাম একলা বাড়িতে নিশ্চিন্ত মনে খায় দায় ঘুমায় আর বই পড়ে। হঠাৎ একদিন অসুখে পড়ল স্যাম। কিন্তু বাড়িতে কেউ নাই বলে সেবা শুশ্রূষা নাই। ক’দিনেই স্যামের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। খাবার দাবার না ফুরালেও একসময় ফায়ার প্লেসের জন্যে রাখা কাঠ ফুরিয়ে গেল। বাইরে থেকে কাঠ আনবার মতো শক্তিও অসুস্থ স্যামের নাই। এরপর স্যাম চেয়ার পোড়াল, টেবিল পোড়াল, শেলফ, বুকশেলফ, তার সমস্ত বই থেকে শুরু করে একে একে ঘরের নানান আসবাবপত্র পোড়াতে লাগল। শীতকাল শেষে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে স্যামের বউটা যখন ফিরে এল, দেখল বাড়িটা একটা ধ্বংসস্তূপ। আর স্যামের দেহটি ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে আছে।

এদেশে এখন ফায়ারপ্লেস দরকার পড়ে না। ফায়ারপ্লেস এখন যেটি থাকে সেটি অনেকটা ঘরের শোভা বাড়াতে। কোনো কোনো বাড়িতে অবশ্য গ্যাস দিয়েও জ্বলানো হয়। কিন্তু মূল কথাটা হলো ফায়ারপ্লেস এখন আগের মতো অপরিহার্য কিছু নয়। আধুনিক এই যুগে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাই ফায়ারপ্লেসের অভাব বুঝতে দেয় না। কিন্তু যদি বিদ্যুৎ না থাকে? যদি না থাকে তাহলে আজকের ৫০ ডিগ্রি নিচে নেমে যাওয়া ডিপফ্রিজ আমেরিকার মানুষেরা জমে শক্ত হয়ে যাবে। আজকের খবরের কাগজ বলছে, আমেরিকার নানান জায়গায় তুষারঝড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। ফলে দু লক্ষ মানুষ বিদ্যুতহীন হয়ে পড়েছে। এবারের ভয়াবহ তুষারঝড়ে এখন পর্যন্ত ৫০ জন মানুষ মরে গেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

পুরনো বছরের শেষ সময়ে আর নতুন বছরের প্রথম লগ্নটিকে বরণ করে নিতে একটি উদযাপন করা হয়। এ উদযাপনের নাম থার্টি ফার্স্ট নাইট। সে লগ্নে সকলে গলা চড়িয়ে চিৎকারে বলে, হ্যাপি নিউ ইয়ার। নতুন বছরটি আমাদের জন্যে সুখ বয়ে আনুক। নিউ ইয়ার যে সেকথা শোনে না, তা কিন্তু নয়। ব্যক্তি পর্যায়ে শোনে বটে কারও কারও কণ্ঠ। হয়ত সেকারণেই কেউ কেউ ভালো থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ লোকেরাই থাকেন না। আমার প্রাণপণ চাওয়াটি হলো ২০২৩ বছরটি সকলের চিৎকারটি না শুনুক সংখ্যাগরিষ্ঠের ডাকটি যেন শোনে। আমরা পয়লা বৈশাখে যেমন গেয়ে উঠি, ‘মুছে যাক গ্লানি/ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’। নতুন বছরে পবিত্র, নির্মল, শুদ্ধ, পরিচ্ছন্ন ধরায় আবার শুরু হোক আমাদের নির্মল জীবন। ২০২২-এ তো হলো না। ২০২৩-এ না হয় নতুন করেই আবার শুরু হোক।

সকলকে হ্যাপি নিউ ইয়ার উইদ আ লটস্‌ অব গ্রিটিংস্‌

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension