আন্তর্জাতিকপ্রধান খবররাজনীতি

বিশ্ব নেতাদের বেশিরভাগ ৭০ পেরিয়ে

প্রথম শতাব্দীর গ্রিক ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিক প্লুটার্ক বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র যখন সমস্যায় পড়ে বা ভয়ে থাকে তখন প্রবীণদের শাসনের জন্য আকুল হয়ে থাকে’। বয়স্কদের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার বিষয়ে তার বিভিন্ন চিন্তাভাবনা পাওয়া যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, বয়সের কারণে একজন ব্যক্তি যে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে পারেন, কম বয়স্করা সেটা পারেন না। তার অভিযোগ, রাষ্ট্র সবসময় বৃদ্ধদের পরিত্যাগ করে। প্লুটার্কের যুক্তি, রাষ্ট্র চায় এমন সব যুবকদের যারা খ্যাতি এবং ক্ষমতার জন্য তৃষ্ণার্ত, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়কের মননের অধিকারী তারা হতে পারে না।

দ্য গার্ডিয়ানে সাংবাদিক ও প্রভাষক কেনান মালিক পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে এখন যারা শাসন করছেন, তাদের সবাই বয়স্ক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গত মাসের বিতর্কে জো বাইডেন যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তা ‘নিকৃষ্ট’। এরপরও বাইডেন, যার বর্তমান বয়স ৭৮; তিনি নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী থাকার বিষয়ে জেদ করছেন। তার এ জেদের বিষয়ে প্লুটার্ক কী বলতে পারতেন? প্লুটার্ক অবশ্য স্বীকার করেন যে, শারীরিক দুর্বলতা বৃদ্ধদের জন্য শত্রু, কিন্তু তাদের যে সাবধানতা এবং বিচক্ষণতা রয়েছে, তার মতো এত বড় নয়।

শুধু বাইডেন নন। কেনান মালিক বলছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়স ৮১। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বয়স একই, ৭১। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বয়স ৭৩; তার পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ শেহবাজ শরিফের বয়স ৭২। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বয়স ৭৪, ফিলিস্তিনের নেতা মাহমুদ আব্বাসের বয়স ৮৮ আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ৮৫। বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনেতা হলেন ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া, যার বয়স ৯১।

অবশ্যই তরুণরাও কোথাও কোথাও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যেমন ফ্রান্সের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আটালের বয়স ৩৫, তিনি সবচেয়ে কম বয়সী রাষ্ট্রনেতা। তাকে হারিয়ে যিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তার বয়সও খুব বেশি হবে না বলে মনে হচ্ছে।

প্যারাডক্স

কেনান মালিক জানাচ্ছেন, আমেরিকান ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিক স্যামুয়েল ময়েন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আধুনিক বিশ্বে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। প্রাক-আধুনিক যুগে প্রবীণদের শাসন ঠিক ছিল। কারণ তখন মনে করা হতো, বয়স্ক ব্যক্তি সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সম্মানীয়। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি মাধ্যম হলেন প্রবীণরা। কারণ তাদের সঙ্গে প্রজ্ঞা আছে। হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্টেও বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। কিন্তু আধুনিক যুগ এসে পুরাতন সামাজিক অবস্থার রূপান্তর ঘটায়। ময়েন বলেন, ফরাসি বিপ্লব প্রাচীন শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে। তখন তারা স্পষ্টভাবে প্রবীণদের ক্ষমতায়নকে লক্ষ্যবস্তু করে। শুধু সাধারণ মানুষের ওপর অভিজাতদের উৎখাত নয় আরও বিস্তৃতভাবে তরুণদের স্বার্থে শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের কর্র্তৃত্ব পুনরুদ্ধার হয় এবং তরুণদের ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে। তবে পশ্চিমা বা তৃতীয় বিশ্বের বয়স্করা ক্ষমতায় অবস্থান করলেও সমাজ ও পরিবারে তাদের অবস্থা করুণ। ক্রমে ভাঙতে থাকা পরিবার, ব্যক্তিসর্বস্বতা প্রবীণদের আরও অসহায় করে তুলছে। এখানে বৈপরীত্য হলো সমাজ, রাজনীতি, পরিবেশ— সবকিছু সবসময় তরুণদের কথা বলে। তাদের জন্য বাজারে পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ, কেনাবেচা হয়। প্রবীণদের জন্য কিছু খুঁজে পাওয়া ভার। অথচ প্রবীণরা আবার ক্ষমতায় বসে আছে। তরুণদের হাতে ওই অর্থে ক্ষমতার চাবিকাঠি নেই। মূলত প্রবীণদের হাতেই শাসনভার, তারাই সবকিছু নাড়াচ্ছেন। এ ধরনের বৈপরীত্য উদ্ভূত হয়েছে আধুনিক সমাজে পণ্য ব্যবস্থাপনা থেকে। যে সমাজে ক্ষমতা এবং সম্পদ নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যে এবং একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সঞ্চিত হয়।

নতুন এলিট

কেনান মালিক আরও বলছেন, ‘বর্ন টু রুল’ বইয়ে সমাজবিজ্ঞানী অ্যারন রিভস এবং স্যাম ফ্রিডম্যান ‘ব্রিটিশ অভিজাতদের তৈরি এবং পুনর্নির্মাণ’-এর বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা বলছেন পুরাতন অভিজাতদের বদলে ‘নতুন অভিজাত’ তৈরি হচ্ছে। এক শতাব্দী আগে যে অভিজাততান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, তার পুনরুত্থান ঘটছে। রিভস এবং ফ্রিডম্যান বলছেন, যারা আগেও সমাজের শীর্ষ শ্রেণিতে জন্ম নিয়ে শাসন করত, এখনো তারা সেসব সুবিধা ভোগ করে। এসব পরিবারই স্কুল, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এমনকি দেশের শাসক শ্রেণিও গঠন করে। কেনান বলছেন, একই সময়ে, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কায়েমে যে রাজনৈতিকব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে প্রাধান্য পেয়েছে স্থিতিশীলতা। অর্থাৎ রাষ্ট্র, সরকারব্যবস্থা বা সমাজ যেন অস্থিতিশীল না হয়— সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের ‘রাজনৈতিক ব্যাঘাত’ যেন না ঘটে, সব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে সেভাবে। যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের নির্বাচনীব্যবস্থা। আর এ কারণে প্রবীণরা শাসন ক্ষমতায় থাকার পক্ষে উপযুক্ত। কারণ তরুণরা হলো ক্ষমতা কাঠামোতে বহিরাগত। প্লুটার্ক যেমন বলছেন, তরুণরা সহজে জনতার দাবি-দাওয়া দিয়ে প্রভাবিত হয়। তারা উত্তেজিত হয়ে জনতাকে নিয়ে নেমে পড়বে। বয়স্কদের সে সমস্যা নেই। তারা সহজে কোনো পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে যাবে না। তারা ধীরস্থির। পুরনো শাসনব্যবস্থার ভেতরেই অল্প অল্প করে পরিবর্তন নিয়ে আসবে তারা। তাতে করে গোটা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না। আর অভিজাতদের এটাই পছন্দ। তারা চায়, নিজেদের বলয়ের ভেতর সব থাকবে। তাদের সমস্যা তৈরি না হয় এ রকম পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন সাধিত হবে।

তরুণদের সংকট

বাংলা ভাষার অমর সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় ‘সবুজ’ ও ‘কাঁচাদের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘আধমরাদের’ ঘা মেরে বাঁচাতে। তিনি সবসময় তারুণ্যের পক্ষে সাহিত্য রচনা করেছেন। তার এ আহ্বান খুবই আধুনিক। প্রাচীন সংস্কার বা রীতি, চলাচলের পুরাতন পদ্ধতির বিরুদ্ধে নতুনের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ সবসময় ছিলেন। যার গুণগত পরিবর্তনও দেখা যায় ভারতে। অনেক তরুণ ভারতের রাজনীতি শাসন করেছেন। তবে নরেন্দ্র মোদির সময়ে এসে তাতে ব্যাঘাত ঘটে কিছুটা। যদিও মোদি প্রথম যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তার বয়স অন্তত দশ বছর কম ছিল। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে তার বয়সও বেড়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে মোদি যদি সরে যান তাহলে হয়তো তার দলই ক্ষমতা হারাবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিষয়টিও একই। তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায়। তার প্রস্থানে একসঙ্গে ভেঙে পড়বে রাশিয়ার অনেক কিছু। চীনের বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন। সেখানে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, চীনের ব্যবস্থা সহজে পাল্টাবে না। তারপরও শি জিনপিং ক্ষমতা থেকে সরে গেলে সেখানেও শোনা যাচ্ছে সংস্কার আসবে। ইরানে নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্বে আসবেন। তিনি তুলনামূলক তরুণ ও উদার। তবে আয়াতুল্লাহ খামেনির বয়স অনেক। তার সঙ্গে তরুণ ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের রসায়ন কেমন জমবে তা অবশ্য দেখার বিষয়।

তারুণ্য ও প্রজ্ঞা

তবে ফ্রান্স ছাড়া প্রকৃতপক্ষে তরুণ কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতায় নেই। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণরা বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নেমেও নিজেদের মতো রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। যেমন আরব বসন্ত। এ আন্দোলন যতটা ওপরে উঠেছিল, ততটা জোরে আছড়ে পড়েছে ভূমিতে। যা তরুণদের সমস্ত স্বপ্ন খান খান করে দিয়েছে। সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ হলো, তাও হতাশা বাড়াবে তরুণদের। কারণ তারা যে আমূল সংস্কার দাবি করেছিল তা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। ইসরায়েলি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিকল্প কিছু গড়ে তোলার সুযোগ নেই। তরুণরা এভাবে তাদের তারুণ্য নিয়ে বিক্ষোভ-সংগ্রাম করলেও ধীরে ধীরে সমাজ অভিজাতদের দখলে চলে যায়। রাষ্ট্রের বাণিজ্য, কূটনীতি, যুদ্ধনীতি— সবকিছু নির্ভর করে এসব এলিটের ওপর। তরুণরা বড়জোর নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে পারে। যদিও বেশিরভাগ তরুণ এখানেও ব্যর্থ হয়।

প্রবীণরা সমাজকে তাদের প্রজ্ঞার মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন, এটা সত্য। তবে নেতৃত্ব তরুণদের হাতে থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ তাদের মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনার বিকাশ ঘটে। আগামীর পথ রচিত হতে পারে তরুণ নেতৃত্বের হাত দিয়ে। তাদের মধ্যে আধুনিক, উদার ও সামগ্রিক চিন্তার বিকাশ ঘটে থাকে। বর্তমান অনলাইনের যুগে তরুণরা আগামীকে আরও সহজে পাঠ করতে পারে। তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে সক্ষম। অন্যদের ভাষা, চিন্তার কাঠামো বুঝতে পারে সহজে। বয়স্ক শাসকদের পক্ষে যা সম্ভব হয় না। ফলে আগামীর পৃথিবীর জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে তরুণদের শাসন।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তরুণরা শাসনক্ষমতায় নেই। প্রবীণদের শাসনব্যবস্থা থেকে তাদের পুরোপুরি মুক্তি ঘটেনি। যদিও বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বিপ্লব, বিক্ষোভ হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় আবার প্রবীণরা ক্ষমতায় বসেছেন। তাদের মধ্য দিয়ে অনেক দেশেই পুরাতন ব্যবস্থা টিকে আছে। তরুণ ও প্রবীণের মেলবন্ধনই এক্ষেত্রে উপযুক্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, তারুণ্যের উদ্যোগ আর প্রবীণের প্রজ্ঞার সমন্বয় পারে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension