
যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি হত্যা: লাশ গুম করতে চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিল অভিযুক্ত ব্যক্তি
আদালতের নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একজন মানুষকে ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হতে পারে?
২৬ বছর বয়সী আবুঘারবিয়েহের বিরুদ্ধে ২৭ বছর বয়সী জামিল লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত শুক্রবার লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ইউএসএফের সাবেক ছাত্র ছিলেন এবং অভিযুক্তের রুমমেটও ছিলেন।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার জীবিত দেখার তিন দিন আগে—অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল রাতে আবুঘারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘যদি কোনো মানুষকে কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে?’
জবাবে চ্যাটজিপিটি বলে, ‘এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।
’ এরপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তারা কিভাবে জানবে?’ ওপেনএআই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এটি তার জামিন বা কারাগারে রাখার বিষয়ে শুনানির জন্য দাখিল করা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল এক রুমমেট দেখেন, আবুঘারবিয়েহ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাম্পস্টার ডাস্টবিনে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স ফেলছেন। পরে সেই ডাস্টবিন থেকে লিমনের কিছু জিনিস পাওয়া যায়, যেমন তার স্টুডেন্ট আইডি ও ক্রেডিট কার্ড।
আরো বলা হয়েছে, ডাম্পস্টার থেকে পাওয়া একটি ধূসর টি-শার্টের ডিএনএ পরীক্ষায় লিমনের জেনেটিক উপাদান পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রান্নাঘরের একটি ম্যাটের পরীক্ষায় নাহিদা বৃষ্টির সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
শুক্রবার তদন্তকারীরা একটি দুর্গন্ধযুক্ত ভারী ময়লার ব্যাগের ভেতর থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করেন। ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে, তার মৃত্যু ‘একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে’ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাহিদা বৃষ্টি এখনো জীবিত আছেন- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা মনে করছেন, আবুঘারবিয়েহ তার মরদেহ সরিয়ে ফেলেছেন। হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, রবিবার নাহিদা বৃষ্টির খোঁজে তল্লাশির সময় মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। তবে সেটি কার দেহাবশেষ, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য জানায়নি।
প্রসিকিউটরদের দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহ দাবি করেছেন, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার দেখা যাওয়ার দিন, অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল তিনি তাদের ক্লিয়ারওয়াটারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তবে তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছেন, ওই রাতেই তিনি ময়লার ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস এবং ফেব্রেজ কিনেছিলেন। এ ছাড়া তার অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের চিহ্নও পাওয়া গেছে।
প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী, তিনি নাহিদা বৃষ্টির গোলাপি মোবাইল কাভারসহ কিছু জিনিস নষ্ট করে ফেলেছিলেন। অভিযুক্তের আইনজীবী হিলসবোরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এই মামলার বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করবেন না।
তদন্তকারীরা আরো জানিয়েছেন, আবুঘারবিয়েহের বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে একটি কাটা দাগ এবং পায়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে তিনি দাবি করেন, রান্নার সময় পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তার আঙুল কেটে গিয়েছিল।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে তিনি বলেন, লিমন ও বৃষ্টির অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না এবং তারা কখনো তার গাড়িতে ছিল না। কিন্তু পরে তদন্তকারীরা এমন তথ্য দেখালে, যা প্রমাণ করে লিমনের ফোন ক্লিয়ারওয়াটারে ছিল এবং সেই এলাকায় তার গাড়িও দেখা গেছে, তখন তিনি তার বক্তব্য পরিবর্তন করেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, আবুঘারবিয়েহ গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, লিমন তার কাছে লিফট চাইলে তিনি লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে ক্লিয়ারওয়াটারে নামিয়ে দেন। তবে তিনি এই ঘটনার কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেননি বলে প্রসিকিউটররা দাবি করেছেন।
সার্চ ওয়ারেন্টে পাওয়া লোকেশন ডাটা অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল তিনি টাম্পা উপসাগরের ওপর থাকা হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি স্থানে গাড়ি নিয়ে থেমেছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই ব্রিজের কাছেই পরে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়।
শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, একটি বাড়িতে কিছু সময়ের অচলাবস্থার পর শুক্রবার আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মারধর, অবৈধভাবে আটক রাখা, মৃত্যুর খবর না জানানো, অননুমোদিত স্থানে মৃতদেহ লুকানো এবং প্রমাণ নষ্ট করার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালত ও জেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তাকে ফ্যালকেনবার্গ রোড জেলে জামিন ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার তার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি, দুজনেই বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। তারা বলেন, তাদের ইচ্ছা হলো দুইজনের মরদেহ যেন ইসলামী রীতি ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে দাফন করা হয়। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।



