
এইচ-১বি ভিসায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব, নতুন বিলে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা নীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের লক্ষ্যে নতুন একটি বিল পেশ হয়েছে কংগ্রেসে, যা ঘিরে শুরু হয়েছে তুমূল আলোচনা ও উদ্বেগ। ‘এন্ড এইচ-১বি ভিসা অ্যাবিউজ অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ নামে প্রস্তাবিত এই বিলে সাময়িকভাবে তিন বছরের জন্য এইচ-১বি ভিসা প্রদান বন্ধ রাখা এবং বর্তমান লটারি পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে ৬৫ হাজার ভিসা ইস্যুর সীমা কমিয়ে ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, আবেদনকারীদের জন্য ন্যূনতম বার্ষিক বেতন ২ লাখ ডলার নির্ধারণ, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এবং একাধিক চাকরিতে যুক্ত হওয়ার ওপর কড়াকড়ি আরোপের কথাও বলা হয়েছে।
প্রস্তাবে আরো উল্লেখ রয়েছে, তৃতীয় পক্ষের স্টাফিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। একইসঙ্গে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে যে সমমানের দক্ষ কোনো মার্কিন নাগরিক পাওয়া যায়নি এবং নতুন নিয়োগের জন্য কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি।
২০২৫ সালে কী বদল?
১৯৯০ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এই এইচ-১বি ভিসা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করতে আসার প্রথা। প্রতি বছর গড়পড়তা ৮৫ হাজার ভিসা দেওয়া হতো।
২০২৫ সালে যে নিয়মে অনেক বদল আনেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তিনি যে সেদেশে ‘অভিবাসী’ চান না, তা চিরকালই ওপেন সিক্রেট রেখেছেন ডন। যে জন্য ২,৫০০ ডলার থেকে প্রথমে লাখ ডলারের ‘বোঝা’, তারপর সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ালে নজরদারি— একের পর এক ‘ক্লজ’ চাপিয়ে ক্রমশ তিনি ভারতীয় তথা বিশ্ববাসীর এই ভিসা পাওয়ার পথে আরো কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছেন তিনি। এতেই শেষ নয়, এর সঙ্গেই লেবার কন্ডিশন অ্যাপ্লিকেশান (এলসিএ) কস্ট-সহ সংশ্লিষ্ট অন্য খরচ চাপানো হয়েছে এইচ-১বি ভিসা অ্যাপ্লিকেশান এর জন্য।
এর আগেই ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিওরিটি (ডিএইচএস) কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, চিরাচরিত লটারি সিস্টেম-এ বদল আসতে চলেছে ২০২৭ সালের সিজন শুরু হওয়ার পর। যেখানে প্রস্তাবিত নিয়মে বলা হয়েছে, এতদিন যেখানে র্যানডম লটারির মাধ্যমে বেছে নেওয়া হতো যোগ্য প্রার্থী, সেখানে কার্যকর হতে চলেছে বিশেষ ‘ওয়েটেড সিলেকশন প্রসেস’। যেখানে শুধুমাত্র ভাগ্যের বদলে, মেধাকে প্রধান বিচার্য বিষয় হিসেবে ধরা হবে।
নতুন নিয়মে চারটি ক্যাটিগরি তৈরি করা হবে সরকার নির্ধারিত ওয়েজ টিয়ার-এর ভিত্তিতে। যে কর্মীকে তার মেধার ভিত্তিতে সর্বাধিক বেতন দিতে আগ্রহী মার্কিন সংস্থা কর্তৃপক্ষ, তাকে ‘লেভেল-৪’ এ রাখা হবে।
এ ভাবে তার থেকে কম পে-প্যাকেজ এর কর্মীকে যথাক্রমে ৩-২-১ লেভেলে তালিকাভুক্ত করা হবে। ৪ লেভেলে থাকা সম্ভাব্য কর্মীর নাম যেখানে লটারিতে চার বারের জন্য ‘এনলিস্ট’ করা হবে, সেখানে ‘লেভেল-৩’ এর কর্মীকে ৩ বার, ২-এর কর্মীকে ২ বার— এভাবে তা কমতে থাকবে এবং স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যাতত্ত্বের নিয়ম মেনে চার বার তালিকাভুক্ত হওয়ার দরুণ, ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে সেই মেধাবী কর্মীর জন্য, যাকে সর্বাধিক বেতন দিতে আগ্রহী সংস্থা কর্তৃপক্ষ। এ ভাবে ‘সেরার সেরা’ মেধাকেই শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই দিতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
কেন চিন্তায় ইউএস সংস্থাগুলো?
মার্কিন কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিক বা হোয়াইট হাউস স্টাফ সেক্রেটারি উইল স্কার্ফ দাবি করেছেন, এইচ-১বি ভিসা দুর্নীতির আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে দেশের মাটিতেই চাকরি পাচ্ছিলেন না মার্কিন নাগরিকেরা। সেই প্রথা বন্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ। বিশ্বের সেরা একাধিক ইউনিভার্সিটি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে ফ্রেশ গ্র্যাজ়ুয়েট’দের নিয়োগ করা যেতেই পারে।
যে সূত্র ধরেই ‘এন্ড এইচ-১বি ….২০২৬’ বিলে দাবি করা হয়েছে, এই ভিসা দেওয়ার জন্য কর্মীর নাম প্রস্তাব করার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে, যে কর্তৃপক্ষ সমমানের শিক্ষিত কোনো মার্কিন কর্মী পাননি এবং এই নতুন বিদেশিকে রোস্টারে নেওয়ার জন্য কাউকে ছাঁটাইও করা হয়নি সংস্থা থেকে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, নতুন নিয়মে ভিসা আবেদনে বহুগুণ বেশি টাকা খরচ সমস্যার একটা পার্ট। দ্বিতীয় সমস্যা পে-প্যাকেজ সংক্রান্ত। আগে বিদেশ থেকে কর্মী আনলে যেখানে মাসে গড়ে ৪.৮৫ লাখ টাকা মাইনে দিলেই হতো, সেখানে মার্কিন শ্রম আইন মেনে বেতন দিতে গেলে অঙ্কটা বেশ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ফলে বিষয়টা দোধারি তরোয়ালের মুখে পড়ার মতো অবস্থা হয়ে পড়েছে মার্কিন সংস্থাগুলোর জন্য।
আরো সমস্যা রয়েছে। বিশ্বখ্যাত সব মার্কিন সংস্থাগুলোর কর্তৃপক্ষ ধরে ধরে ‘পিক অ্যান্ড চুজ়’ করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেরা মাথাগুলো তুলে আনতেন। যারা সংস্থার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করতেন। এখন তাদের বাদ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কর্মী নিতে হলে, মেধার প্রশ্নে আগামী দিনে কতটা কম্প্রোমাইজ় করতে হবে, আশঙ্কা থাকছে সেখানেও।
ভারতীয়রা চাপে কেন?
খুবই সহজ। যে জন্য মার্কিন সংস্থাগুলো ‘উদ্বিগ্ন’, ঠিক সেই কারণেই চাপ বাড়ছে ভারতে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছরই বার্ষিক এইচ-১বি ভিসার কোটার ৭১ শতাংশ রয়েছে ভারতীয়দের দখলে। তাই কতটা কাটছাঁট হতে চলেছে, তা নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাতের ঘুম উড়ে গেছে সবারই।
ট্রাম্পপন্থীদের দাবি, মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন-এর যে স্লোগান তুলেছিলেন ট্রাম্প, এইচ-১বি ভিসা পথে সিঁদ কেটে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান বাধা ভারতীয়রা। দলে দলে ভারতীয় প্রতি বছর মার্কিন মুলুকে আসায় নিজভূমে পরবাসী হয়ে চাকরি পাচ্ছেন না ইউএস সিটিজেনরাই।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



