
গণমাধ্যম কেন প্রতিপক্ষ ?

ভোট দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আর আমি ক্রমশ আহত হচ্ছি। বিপর্যস্ত হচ্ছি মানসিকভাবে। ভোটের মাঠে আহত হচ্ছেন আমার সহকর্মীরা। আমাদের কোনও প্রতিপক্ষ নেই। মাঠে খবর কুড়োতে যাই। পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের কাজ। একাজ করতে গিয়ে হামলা-মামলা এমনকি হত্যার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। যখন কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের প্রয়োজন, তখন সংবাদকর্মীদের সোহাগ করেন দুই হাত বাড়িয়ে। যেই না কাজি ফুরুলো,তখনই আমরা ‘পাজি’! কত ‘অখ্যাত’ মানুষ নেতা, তারকা হয়ে গেলেন সংবাদকর্মীদের উদারতায়। কত প্রতিষ্ঠান, দল জনগণের কাছে পরিচিত হলো গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। সেই ফিরিস্তি মহাসড়ক সমান দৈর্ঘ্যকেও হয়তো ছাড়িয়ে যাবে। এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মৌসুম শুরু আগের কথাই যদি ধরি-কত ‘পাতি নেতা’, সম্ভাব্য নেতা-প্রার্থী সংবাদকর্মীদের পেছনে পেছনে ঘুরেছেন। একটু তাদের নাম যেন পত্রিকায়, টেলিভিশনে জায়গা পায়। ডাক পড়ে যেন টকশোতে। ‘অখ্যাত’ দলগুলো যখন ঘুরছে বড় দলগুলোর দুয়ারে জোটের তালিকায় নাম তোলার জন্য, সাংবাদিকদের সোহাগ ছিল তখনও। এইতো দিন কয়েক আগে মনোনয়নপত্র বিলি ও জমা দেওয়ার সময়ও সাংবাদিকদের তোষামোদ করে বেড়িয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা, তাদের নাম ও ছবি গণমাধ্যমে জায়গা করিয়ে নেওয়ার জন্য। এখন সেই প্রক্রিয়া শেষে আয়োজন যখন ভোটের দিনের দিকে এগুচ্ছে তখন পাল্টে যাচ্ছে প্রার্থী এবং দলের আচরণ।
আমরা ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে গত কয়েকদিনে দেখতে পেলাম ভোটের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে তো বটেই, ভাঙা হয়েছে ক্যামেরা, গাড়ি। ভোটের মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বিভিন্ন দল।এক পক্ষের সঙ্গে অপর পক্ষের সহিংসতা হোক সেটা আমরা দেখতে চাই না। চাই ভোটের মাঠ উৎসবের থাকুক। রণক্ষেত্র দেখতে চাই না আমরা। কিন্তু তারপরও সহিষ্ণুতার ঘাটতির জন্য দুইপক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ভোটের মাঠে উত্তেজনা ছড়ায়। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটে প্রাণহানির ঘটনাও। এদৃশ্য এবারও অনুপস্থিত নয়। তবে এমন দৃশ্য ধারণ করতে গিয়েই রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীদের। ভোটের বাকি দিনগুলোতে এই আচরণ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা গণমাধ্যম কর্মীদের।
রাজনৈতিক দলের কর্মীরা মাঠে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর হামলা করছে, এটা দৃশ্যমান। দৃশ্যের আড়ালেও অনেক ঘটনা ঘটে থাকে। ফোনে বা ডেকে নিয়ে হুমকি দেওয়াও অভিযোগ আছে মাঠের গণমাধ্যম কর্মীদের। কাকে কম দেখানো হলো টিভিতে, পত্রিকায় কম লেখা হলো। এসব নিয়েও অভিযোগ আছে। ভোটের প্রার্থীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিকভাবে প্রভাবশালী বলে গণমাধ্যম কর্মীদের চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকিও দিয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।
ভোটের পরে দেখে নেওয়ার হুমকিতো বরাবর থাকেই। এবারও এতসব হুমকি নিয়েই গণমাধ্যম কর্মীরা মাঠে আছেন। ‘খামোশ’ এর মতো বোমারু ধমক খেয়েও যৌক্তিক প্রশ্ন করতে বুক কাঁপছে না তাদের। বরং গুণিতক সাহস নিয়ে আরও জোরালো প্রশ্ন করছেন তারা। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পরেও পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরছে না কেউই। কারণ আমরা জানি ভোটের ফলাফলের পর একটি বড় অংশ পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে আসবেন এই গণমাধ্যম কর্মীদের কাছেই। যারা জয়ী হবেন তারা সাময়িক অহংবোধের চূড়ায় উঠে বসবেন। কিন্তু সেই পাহাড়ের ধস ঠেকাতে তারাও গণমাধ্যম কর্মীদের পাশে চাইবেন, এই প্রক্রিয়াতে গণমাধ্যম কর্মীরা অভ্যস্ত। তবে আগে যেমন করে গণমাধ্যম কর্মীরা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন, রাজনৈতিক কর্মীরা যেমন সমীহ করতেন, সেই বাস্তবতা থেকে আমরা এখন অনেক দূরে। এই হাওয়া বদলের প্রথম কারণ–গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা কোনও কোনও রাজনৈতিক দলকে নিকট আত্মীয় ভাবতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়-রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এই ব্যবসায়ীরাই আবার গণমাধ্যমে পুঁজির জোগানদাতা। তৃতীয়ত-পেশার গুণগত মানও কমেছে খানিকটা। ফলে মাঠের পেশাগত লড়াইয়ে গণমাধ্যম কর্মী কখনও কখনও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক নেতা ও দলের জন্য অশোনি সংকেত হলো– তারা যে ভোটের খেলায় নেমেছেন, তা কতটা ‘পরিচ্ছন্ন খেলা’ হলো, সেই রায় কিন্তু এই নিঃসঙ্গ শেরাপারই দেবেন। তাদের রায়ই মেনে নেবেন জনমানুষ। অতীতেও যেমন নিয়েছেন। অতএব-ভোটের মাঠে গণমাধ্যম কর্মীকে প্রতিপক্ষ ভাববেন না। আমরা উৎসবের খবর কুড়োতে যাই। আপনারা উৎসবকে রণক্ষেত্র বানাবেন, সেই দায় কেন আমাদের হবে?
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি
-রানশু
