
শিশুর টিকা নিয়ে দ্বিধা
বিশ্বজুড়েই শিশুদের সুস্থ রাখতে হাম, মাম্পস, পোলিও, ডিপথেরিয়া, রোটাভাইরাস, মেনিনজাইটিস, হুপিং কাশিসহ বিভিন্ন ধরনের টিকা দেওয়া হয়। বিবিসির স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানবিষয়ক সাংবাদিক জেমস গ্যাল্লাঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তুলেছেন, শিশুদের টিকা তালিকায় কি এবার কভিড-১৯ টিকা যুক্তের সময় এসেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ছয় লাখ শিশুকে করোনা টিকা দিয়েছে যাদের বয়স ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। আগামী বছর নাগাদ দেশটি আরও শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু করবে। যুক্তরাজ্য সরকারও দেশটির ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের প্রায় ছয় লাখ শিশুকে এরই মধ্যে কভিড-১৯ টিকা দিয়েছে। আগামী বছর দেশটি এর থেকেও কম বয়সের শিশুদের টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কভিড টিকা শিশুদের জীবন রক্ষা করবে কিনা। বৈজ্ঞানিকভাবেই এখন এই প্রশ্ন উঠছে। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বেশ জটিল। কারণ, এক এক দেশের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নের উত্তর এক এক রকম হবে। এক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। শিশুদের টিকা দেওয়া উচিত হবে নাকি ওই টিকা অন্যান্য দেশে পাঠিয়ে ওইসব দেশের স্বাস্থ্যকর্মী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দিলে তাতে বেশি জীবন রক্ষা পাবে সেটা বিবেচনা করা উচিত। এখন পর্যন্ত শিশুদের কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কম।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন কমিটির সদস্য অধ্যাপক অ্যাডাম ফিন বলেন, ‘সৌভাগ্যজনকভাবে এই মহামারীর মধ্যেও অল্প কিছু ভালো জিনিসের একটি হচ্ছে, শিশুদের বেলায় এই ভাইরাসে মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।’ সংক্রমিত হলেও শিশুদের শরীরে রোগের উপসর্গ খুবই কম থাকে বা একেবারে থাকেই না। সেই তুলনায় বয়স্কদের শরীরে রোগের উপসর্গ অনেক বেশি দেখা যায় এবং মৃত্যুঝুঁকি বেশি। তাই তাদের আগে টিকা দেওয়া উচিত। বিবিসি জানায়, শিশুদের করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সাত দেশে গবেষণা চালানো হয়েছে। লানসেট ম্যাগাজিনে ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহামারীতে প্রতি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে দুজনের কম শিশু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
শিশুদের কভিড টিকা লাভজনকও হতে পারে। বয়স্কদের সুরক্ষায় অনেক সময় শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। কিছু কিছু দেশ এই কৌশল অবলম্বন করে। যেমনÑ ফ্লুর বেলায় যুক্তরাজ্য এই কৌশল অবলম্বন করে। যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর ২ থেকে ১২ বছরের শিশুদের ফ্লু প্রতিরোধে নাকের স্প্রে দেওয়া হয়। মূলত তাদের পরিবারের বয়স্কদের সুরক্ষায় এই কৌশল ব্যবহার করা হয়।
অনেকের মতে কভিড-১৯-এর বেলায়ও একই কৌশল নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করতে। কোথাও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেলে সেখানে বেশিরভাগ মানুষের দেহেই অ্যান্টিবডি থাকে। ফলে ভাইরাস সেভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে না। করোনাভাইরাস নিয়ে এখন পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা এই ভাইরাসের বিস্তারে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। কিন্তু কিশোর-কিশোরীদের ভাইরাস বিস্তারে ভূমিকা আছে। তাই কেউ কেউ মাধ্যমিক স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনার কথা বলছেন। কিন্তু এটা যে লাভজনক হবেই সে কথা বলা যাচ্ছে না।
একটি শিশুকে টিকা দিতে গেলে কে টিকা পাচ্ছে না, নৈতিকভাবে সেটা মনের ওপর চেপে বসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকেও বলা হচ্ছে, ধনী রাষ্ট্রগুলোর উচিত তাদের শিশুদের কভিড-১৯-এর টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে সেই টিকা বিশ্বের বাকি দেশগুলোকে দান করা।❐



