
যোজন দূরে যুক্তরাষ্ট্র
পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পর বিশ্বের সমরাস্ত্র সম্ভারে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। একাধিক দেশ অনেকদিন ধরেই এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সফলতা পেয়েছে উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়া। উত্তর কোরিয়া ও চীন এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেললেও এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে তারা তা ব্যবহার করতে পারেনি।
এই প্রথমবার যুদ্ধক্ষেত্রে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রাশিয়া। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার এই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগের ফলে সামরিক অঙ্গনে বিশ্ব নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। আর এই নতুন যুগে অনেক পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভা-ারে টমাহক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাত্রার ক্রুজ মিসাইল থাকলেও হাইপারসনিকের তুলনায় ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অনেকদিন ধরেই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। একাধিকবার তারা ব্যর্থও হয়েছে। শব্দের চেয়ে সাত-আটগুণ গতিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে নতুন করে হাত দেবে। তারা জুমওয়াল্ট নামের তিনটি ডেস্ট্রয়ারে ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করবে বলে জানা গেছে। তবে জাহাজে এমন ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হলে গোটা জাহাজে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বহরে এখন যে রণতরী ও ডেস্ট্রয়ারগুলো আছে, সেগুলো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য উপযুক্ত নয়। এর প্রথম কারণ, জাহাজের অ্যারোনটিক। বিশালাকার জাহাজগুলো এতদিন বাতাসের যে চাপকে মাথায় রেখে তৈরি করা হতো, হাইপারসনিকের ক্ষেত্রে সেই চাপ কয়েকগুণ বেশি হয়।
এছাড়া এই জাহাজগুলোর বন্দুক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে প্রচলিত জিপিএস ব্যবস্থায়। ফলে ৯০ মাইলের বেশি দূরত্বে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে না। আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোর সঙ্গে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গুণগত পার্থক্য রয়েছে। আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইলের গতি ঘণ্টায় ৩ হাজার ৮০০ মাইল হলেও, উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার আগ পর্যন্ত একে শনাক্ত করা যায় আধুনিক রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের তুলনায় অন্তত দশগুণ গতিসম্পন্ন হওয়ায় একে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। রাশিয়া সম্প্রতি যে দুইটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে তার একটিও রুখতে পারেনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বর্তমান অ্যাজেইস প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে অকার্যকর।
১৯৮০ সাল থেকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত দশ হাজারের বেশি কর্মীকে এই প্রকল্পে কাজে লাগিয়েছে দেশটি। টেনিসির ডেমোক্র্যাট নেতা জিম কুপার জানান, ‘আমরা যদি এই ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন চাই, তাহলে এই প্রকল্পে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এমন আরও দক্ষ জনবল দরকার আমাদের।’ গত ডিসেম্বরে রাশিয়া তাদের জিরকন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়। হাইপারসনিক নিয়ে মস্কোর চলমান পরীক্ষা নিরীক্ষার অংশ হিসেবেই ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দাবি করেছিল যে, রাশিয়া তার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে বাড়িয়ে বলছে। কিন্তু রাশিয়া যে ভুল বলেনি তার প্রমাণ ইউক্রেনে দেশটির চালানো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।



