
কোভিডের আড়ালে নেপালের ব্যবসায়ীদের ওপর চীনের অবরোধ
গত দুই বছর ধরে নেপালের ওপর ‘অঘোষিত’ অবরোধ আরোপ করেছে চীন। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধের নামে ২০২০ সালের প্রথমদিক থেকে এই অবরোধ শুরু হয়েছে। নেপালি ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বড় বাধা তৈরি করেছে এবং তাদের জীবিকাকেও প্রভাবিত করেছে। এই অবরোধের বিরুদ্ধে এ বছরের শুরুর দিকে নেপালের ব্যবসায়ীরা বেশ কয়েকটি সীমান্ত ক্রসিংয়ে চীন বিরোধী বিক্ষোভ করেছে।
চীনের পদক্ষেপের ফলে নেপাল-চীন সীমান্তজুড়ে ভোগ্যপণ্যের পরিবহনের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে, যা লাখ লাখ নেপালি রুপির লোকসানের কারণ হয়েছে। অঘোষিত অবরোধ আরোপসহ চীনের কঠোর হস্তক্ষেপের কারণ ভারতের প্রতি নেপালি প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার ঝোঁক। এটি নেপালের প্রতি চীনের অসন্তোষের দেখানোর একটি কৌশলী পদক্ষেপ।
এ বছরের জানুয়ারির শেষে নেপালি ব্যবসায়ীরা রাসুওয়াগাধিতে একটি বিক্ষোভ করেছিল। ব্যবসায়ীরা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।
যাতে লেখা ছিল- ‘কন্টেইনারগুলোর নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করুন, সীমান্তে নেপালিদের বসবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলুন এবং অঘোষিত অবরোধ শেষ করুন’। সিন্ধুপালচক জেলার তাতোপানির স্থানীয় বাসিন্দারা এর আগেও চীনের অবরোধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিল।
চীন ও নেপালের মধ্যে রাসুওয়াগাধি ও তাতোপানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক পয়েন্ট। এ দুই পয়েন্টে চীন প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই-তিনটি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে। অথচ আগে সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করত। বর্তমানে এ দুই দেশের মধ্যে ইলিশ, নাগচা, কো রালা, গোর্খা লারকা, রাসুওয়াগাধি, তাতোপানি, লামাবাগার, কিমাথাঙ্কা এবং ওলাংচুং গোলাসহ নয়টি বাণিজ্য পথ রয়েছে। এর মধ্যে রাসুওয়াগাধি এবং তাতোপানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে।
নেপালি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে প্রায় ৩০০ ট্রাক কেরুং ও তাতোপানি সীমান্ত পয়েন্টে আটকা পড়েছে। চীন সরকার তাদের ভিসা না দেওয়ায় চীন থেকে নতুন পণ্যের অর্ডার দেয়াও বন্ধ করে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
গত ১৩ জানুয়ারি কাঠমান্ডুতে চীনা দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা নেপালে কার্গো পরিবহন চালু করেছে। বলেছে, ‘চীন অনেক অসুবিধা কাটিয়ে নেপালে একমুখী কার্গো পরিবহন চালু করেছে এবং বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়েছে, যা নেপালে মহামারিবিরোধী ও জীবিকা নির্বাহের উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমরা বর্তমান জটিলতাগুলো কাটিয়ে নেপালি পক্ষের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছি।’
এই অঘোষিত অবরোধের শুরুটা গত বছরের শুরুতে বলা যেতে পারে। কারণ, ব্যবসায়ীরা বলেছে, তাদের কনটেইনার ট্রাকগুলো ১৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে সীমান্ত পার হতে পারছে না। সেই সময়ে নেপাল ন্যাশনাল ট্রেডার্স ফেডারেশনের সভাপতি নরেশ কাতুওয়াল বলেছিলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর অজুহাতে উত্তর সীমান্তে চালান আটকে রাখা হয়েছিল।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাঠমাণ্ডু পোস্টকে কাতুওয়াল বলেন, “আমরা চীনের এই আচরণকে একটি অনানুষ্ঠানিক অবরোধ হিসাবে নিয়েছি। এই অবস্থা চলতে থাকলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করে কোনো লাভ নেই। ২০২০ সালের অক্টোবর-নভেম্বর উৎসবের মওসুমে জামাকাপড়, জুতা, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্স এবং শিল্পের কাঁচামাল বোঝাই প্রায় ২ হাজার কন্টেইনার সীমান্তে আটোনো হয়েছিল। চীন মাত্র কয়েকটি ট্রাক নেপালে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। পরবর্তীতে বেশিরভাগ আমদানিকারক তাদের পণ্য কলকাতার মাধ্যমে পুনরায় রুট করেছিলেন।
এর সার ফলাফল হলো নেপাল ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যে ব্যাপক ঘাটতি হয়েছে। নেপালের বাণিজ্য ও রপ্তানি উন্নয়ন কেন্দ্রের মতে, নেপালে চীনের রপ্তানি মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।
চীন নেপালে মূলত ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং পোশাক রপ্তানি করে। নেপাল কার্পেট, হস্তশিল্পের সামগ্রী এবং ঐতিহ্যবাহী আইটেম চীনে রপ্তানি করে। চীনে নেপালের রপ্তানি ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
নেপাল ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে ৯৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন রুপির চীনা পণ্য কিনেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১৮ দশমিক ২৫ বিলিয়ন রুপি থেকে কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে চীনে রপ্তানিও ৫০ শতাংশ কমেছে। শিপমেন্টের মূল্য ছিল ৫০০ মিলিয়ন রুপি, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ১ দশমিক ০২ রুপি থেকে কম।
নেপাল সরকার এই সমস্যার একটি কূটনৈতিক সমাধানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কিন্তু কোনো ফলাফল আসেনি। এরই মধ্যে চীনা পরিবহনকারীরা মালবাহী পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে। চীনা সীমান্ত পয়েন্ট থেকে নেপালের সীমান্ত পয়েন্টে ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে পণ্য পরিবহনের খরচ প্রতি কনটেইনার ১৫-১৬ হাজার আরএমবি থেকে ৬০-৬৫ হাজার হয়েছে।
নেপালের প্রতি চীনের অব্যাহত উদাসীন মনোভাব প্রধানমন্ত্রী দেউবার কথিত ভারতপন্থী ঝোঁক এবং নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিকে একত্র রাখতে চীনের অক্ষমতা। ফলে চীনের অযৌক্তিক চিন্তা প্রক্রিয়ার ফল ভোগ করতে হচ্ছে নেপালের জনগণকে।
ইকোনোমিক টাইমস



