প্রধান খবরবাংলাদেশ

জলাতঙ্কের টিকাতেও সংকট, মন্ত্রী বললেন ‘মজুদ আছে’

হামের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক শিশু মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যেই বাংলাদেশে মরণব্যাধি জলাতঙ্কের টিকার মজুদ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যেখানে জলাতঙ্ক এমন এক মরণব্যাধি যেখানে মৃত্যুর হার প্রায় শতভাগ।

একদিকে যখন সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্কের টিকার সংকট, তখন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা হামসহ অন্যান্য টিকার মজুত কতটা আছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য বলেছেন, দেশে জলাতঙ্কসহ কোনো টিকারই সংকট নেই।

তবে বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। হাসপাতালগুলোতে টিকার সংকট থাকায় বাইরের ফার্মেসি থেকে বাড়তি দামে কিনে আনতে হচ্ছে টিকা।

জলাতঙ্কের দুই ধরনের টিকা রয়েছে। একটি হচ্ছে এআরভি বা অ্যান্টি র‍্যাবিস ভ্যাকসিন।

এটি শরীরকে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্দীপিত করে এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়। অন্য ভ্যাকসিনটি হচ্ছে আরআইজি বা র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন। এতে আগে থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি থাকে, যা কামড় খাওয়া মানুষের দেহে সরাসরি ভাইরাসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়।
কুকরের কামড় একটু বেশি ক্ষত তৈরি করলে আরআইজি ভ্যাকসিন দেয়া হয়।

বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় ধরনের ভ্যাকসিনেরই তীব্র সংকট রয়েছে। কারণ সরকারিভাবে এটির কোনো সরবরাহ নেই।
ছেলেকে কুকুরে কামড়ানোয় শ্রমজীবী রুবি আক্তার টিকা দিতে মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এসেছিলেন।

তিনি জানান, ‘ফার্মেসি থেকে বললো টিকার দাম নয়শো টাকা। কিন্তু আমার কাছে নয়শো টাকা নাই।

আমি তো দিন হাজিরা পাই তিনশো টাকা করে। পরে বাড়িওয়ালার কাছে গেলাম টাকা ধার করতে। সেই টাকা দিয়ে টিকা কিনলাম।’
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে ত্রিশজন মানুষে বিড়াল কিংবা কুকুরের কামড় খেয়ে হাসপাতালে আসেন টিকা নিতে। কিন্তু সরকারি টিকা সেভাবে পান না।

এর কারণ ঢাকা থেকে কোন টিকা সরবরাহ না করে হাসপাতালগুলোকে বলা হয়েছে নিজস্ব ফান্ড থেকে নিজ উদ্যোগে টিকা কিনতে। তবে আলাদা বাজেট না থাকায় হাসপাতালগুলো সেভাবে টিকা কিনতে পারছে না।

মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীর জানান, ‘আমাদের অন্য ফান্ড থেকে যে সামান্য কিছু টাকা বেঁচে গেছে সেটা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এখন ধরেন আমরা একশত বিশটা ভ্যাকসিন কিনেছি। আমাদের টার্গেট হচ্ছে একশত বিশটা ভ্যাকসিন দিয়ে এক মাস চালানো। যদি আমি সবাইকে দিতে যাই তাহলে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন শেষ হয়ে যাবে। বাকি বিশ দিন কেউ ভ্যাকসিন পাবে না।’

সংকটের কথা জানিয়ে আহাম্মদ কবীর আরো বলেন, ‘আমরা এখন টিকার রেশনিং করছি। যাদের জরুরি প্রয়োজন, যারা খুবই দরিদ্র তাদেরকে আমরা বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিচ্ছি। আর যারা অ্যাফোর্ড করতে পারে কিংবা বিড়াল বাসায় পালে তাদেরকে বলছি আপনারা ভ্যাকসিনটা কিনে দেন।’

মুন্সীগঞ্জ শহরে কিছু পরিমাণ টিকা পাওয়া গেলেও শহরের বাইরে উপজেলাগুলোতে কোনো টিকাই নেই বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

তবে ঢাকার মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আবার টিকার শতভাগ সরবরাহ আছে। সাভার সহ ঢাকার আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে এখানে এসে টিকা নিতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।

ঢাকায় টিকার ‘বাফার স্টক’ নেই

বাংলাদেশ সরকারের টিকা কার্যক্রমের মূল উদ্যোগ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই-এর অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিস প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকটি টিকা পরিবহনের ট্রাক ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে।

ইপিআইয়ের অধীনে হামের টিকার সংকটের কারণে ইতোমধ্যেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

এরমধ্যেই জরুরিভিত্তিতে হামের টিকা আনতে পারায় সারাদেশে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছে সরকার।

কিন্তু ইপিআইয়ের অধীনে থাকা ৯টি টিকার যে সামগ্রিক মজুত, সেখানে ঘাটতি আছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন সংশ্লিষ্ট একজন কর্মী জানান, এই কেন্দ্রীয় গুদামে ‘টিকার স্টক নেই’।

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমটির কাছে একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, টিকার মজুত শেষ।

তিনি বলেন, “নিয়ম হচ্ছে, সারাদেশে টিকার যে চাহিদা আছে সেগুলো সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু এগুলো বাদ দিয়েও অন্তত তিন মাসের আলাদা স্টক রাখতে হবে। এটাকে আমরা বলি ‘বাফার স্টক’। এই বাফার স্টকটা নেই।”

টেলিফোনে বিবিসিকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ জানান, ‘সমস্যা আছে। কিন্তু এই সমস্যা থাকবে না। আমরা প্রকিউরমেন্টে চলে গিয়েছি। আশা করছি আগামী মাসেই টিকা চলে আসবে।’

ইপিআইয়ের অধীনে ৯টি টিকা দেয়া হয়। এর মধ্যে যক্ষা প্রতিরোধে দেয়া হয় বিসিজি টিকা, ওপিভি টিকা দেওয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় পিসিভি টিকা, হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা এবং টাইফয়েড প্রতিরোধে দেয়া হয় টিসিভি টিকা দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে ৯টি টিকার মধ্যে বেশ কয়েকটি টিকার মজুত একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। একটি মাত্র টিকার মজুত আছে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।

বাফার স্টকের অবস্থা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘বাফার স্টকটা এজন্য দরকার যে, ইপিআই কর্মসূচি যদি যে কোনো কারণে কখনো বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এখন যেমন হামের মহামারি হলো, এরকম অন্য রোগেরও মহামারি হতে পারে। সেজন্য বাফার স্টকটা রাখতে হয়। এটা না থাকা হলো একটা ঝুঁকি।’

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য টিকা সংকটের বিষয়টি নাকচ করছেন।

বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, ‘আমাদের ছয় মাসের স্টক আছে। নয়টা ভ্যাকসিনের সবগুলোই আমাদের হাতে আছে। যক্ষার বিসিজি টিকাসহ সব টিকা আমাদের হাতে আছে। কোনো সমস্যা নেই।’

ইপিআই থেকে টিকার সংকট নিয়ে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আপনি বললে তো হবে না। একটা টিকারও সংকট নেই।’

জলাতঙ্কের টিকার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জলাতঙ্কের টিকার একটা ক্রাইসিস হয়েছিলো। এটা আমরা মোকাবেলা করেছি।’

ঢাকার বাইরে টিকার সরবরাহ নেই তাও মানতে নারাজ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘এমএসআর ফান্ড থেকে তারা সবাই (হাসপাতালগুলো) লোকালি কিনছে। কোথাও কোনো অভাব নেই। এডিবি ফান্ড থেকেও কেনা হচ্ছে। টিকা নিতে এসে কেউ আমাদের কাছ থেকে ফেরত যাচ্ছে না, দেওয়া হচ্ছে।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension