
ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির গুরুত্ব
মোঃ জাহিদুল ইসলাম
ভূমিকম্প একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে উঠেছে । মূলত এই প্রযুক্তিগুলো দুর্যোগের আগে, চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণীর অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে। এ বিপদাশংকায় কখন যে ভূমিকম্প আঘাত হানবে আবার কখন যে কে তার শিকার হবে সবকিছুই অজানা। তাই ভূমিকম্প নিয়ে কমবেশি আতঙ্ক সবার মধ্যেই রয়েছে। ছবির মতো সুন্দর তুরস্কে ভূমিকম্পে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সেই আতঙ্কে বাংলাদেশেও সম্প্রতি অনেকেই ভুগছেন। তাই এখন আতংকিত হলে চলবে না। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ভূমিকম্পে বিল্ডিং সাধারণত দুমড়েমুচড়ে গায়ে পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেলে পড়ে । এ সময় নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে হলে কিছু প্রয়োজনীয় কৌশল অবলম্বন করতে হবে । বিল্ডিংয়ের ভিম কিংবা কলামের পাশে শক্ত কোন কিছুর পাশে থাকা কিছুটা নিরাপদ। বিশেষ করে খাট কিংবা শক্ত ডাইনিং টেবিল হলে আরও বেশি ভালো। তাই ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ভবন নির্মাণে প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল এবং নতুন কম্পোজিট উপকরণ ব্যবহার করে এমন কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যা তীব্র ভূকম্পন সহ্য করতে পারে। ভূমিকম্পের সময় ঐতিহ্যবাহী যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায়শই ভেঙে পড়ে। সেই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে স্যাটেলাইট ফোন এবং দুর্যোগ-সহনশীল ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কগুলো জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া এখনও সম্ভব হয়নি। তবে সিসমোগ্রাফ ও অন্যান্য সেন্সর ব্যবহার করে ভূমিকম্প শনাক্ত করা যায়। এছাড়াও আধুনিক “আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম” ভূমিকম্পের প্রাথমিক তরঙ্গ শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যে বিপদ সংকেত পাঠাতে পারে। এই অল্প সময়টুকু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বা প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে সাহায্য করে যদিও তা যথার্থ নয়। এদিকে উন্নত সেন্সরের পাশাপাশি ইন্টারনেট অফ থিংস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টারনেট অফ থিংস প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করা সম্ভব। এই ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণ করে কার্যকর সতর্কবার্তা পাঠানো যায়। এই মূল্যবান ডেটা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মূল্যবান সময় দেয়। ভূমিকম্পের গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য যুক্তিভিত্তিক তথ্য অপরিহার্য। এই যুক্তিভিত্তিক তথ্য মূলত ভূমিকম্পের কারণ, পরিমাপ এবং প্রভাবের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ভূমিকম্পের কারণ হলো টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া। এই টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া পরিমাপ করা হয় সিসমোমিটারের মাধ্যমে। সিসমোমিটার ভূমিকম্পের সময় ভূ-পৃষ্ঠের কম্পন রেকর্ড করে। এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের ধ্বংসাত্মক দিক বুঝা যায়। এর দ্বারা ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। এছাড়াও স্যাটেলাইট চিত্র, সিসমিক ডেটা এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের তীব্রতা, প্রভাবিত এলাকার মানচিত্র এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের চাহিদা সম্পর্কে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। অপরদিকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম কাজে ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ড্রোন, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, জিপিএস, স্যাটেলাইট ইমেজিং প্রযুক্তি এবং বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী রোবট ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি উদ্ধারকারীদের জন্য কাজকে দ্রুততর এবং নিরাপদ করে তোলে। এদিকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা যেতে পারে। এভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবেলায় মানুষের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনারও এটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।



