
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: প্রসিকিউশনের উদাসীনতায় ১৩ বছর ঝুলছে বিচার
সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি এখনো। ১ হাজার ১৩৬ প্রাণহানির এ মামলায় উচ্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে অনেক আগে; কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া এখনো আটকে আছে সাক্ষ্যগ্রহণে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, শেখ হাসিনার আমলে সদিচ্ছার অভাবে এই মামলার বিচার এগোয়নি। এই ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। অন্যদিকে বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে। তাদের প্রশ্ন-এত প্রাণহানির দায় নির্ধারণে আর কত সময় লাগবে?
১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাককর্মীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। ওই নির্দেশনার ২৬ মাস পার হলেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। আগের মতোই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে।
বর্তমানে হত্যা মামলাটি ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলায় এখন পর্যন্ত ৫৯৪ সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন ৮ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। ৩০ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
এছাড়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইনে আরেক মামলার বিচারও ঝুলে রয়েছে। মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। এ মামলায় ১৩৫ জন সাক্ষীর মধ্যে একজনেরও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ২০ এপ্রিল এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন প্রসিকিউশন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির করতে পারেনি। এ কারণে ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এডিশনাল পিপি) ফয়সাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার আমলে এই ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া হয়েছে। তাদের সদিচ্ছার অভাবে এ মামলার বিচার এগোয়নি। দিনের পর দিন পার হলেও রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে মামলা শেষ করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আওয়ামী সরকারের পতনের পর মামলাটি নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আসামি সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন যুগান্তরকে বলেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হচ্ছে না। সোহেল রানা ১৩ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আছেন। যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ের দায় কে নেবে-এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, এখন পর্যন্ত সাক্ষ্যপ্রমাণে সোহেল রানার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসামি ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মামলার বিবরণ : ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা ভবন। এর নিচে চাপা পড়েন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক। ওই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত ও পঙ্গু হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৪৩৮ জনকে। ঘটনার পর সাভার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে ‘অবহেলা ও ত্রুটিজনিত’ কারণে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার ৪১ আসামির মধ্যে চারজন মারা গেছেন। তাদের বাদ দিয়ে হত্যা মামলায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৩৭ জন। তাদের মধ্যে ২৫ জন জামিনে রয়েছেন, ১১ জন পলাতক এবং একমাত্র সোহেল রানা কারাগারে রয়েছেন। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
অন্যদিকে একই ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজউকের কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন সাভার থানায় আরেকটি মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল ওই মামলায়ও সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলায় ১৩৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
ঘটনার পাঁচদিন পর ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোল থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ২০২২ সালে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন সোহেল রানা। ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ৯ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই জামিন স্থগিত করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিতাদেশ বহাল রাখেন এবং একই সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।
ইমারত আইনের মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ইশতিয়াক হোসেন জিপু যুগান্তরকে বলেন, মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়নি। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর, দোষীদের শাস্তি দাবি : রানা প্লাজা ধসের পর কেটে গেছে ১৩ বছর। কিন্তু এর বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)। সংগঠনটি বিচার ত্বরান্বিত করাসহ কলকারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘সম্মিলিত তদারকি কমিটি’ গঠনের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শুধু বিচার নয়, বরং শিল্প খাতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আইবিসি আয়োজিত ‘রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর : পোশাকশিল্পে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা।
আইবিসির সিনিয়র সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে কর্মক্ষেত্রে আর কোনো শ্রমিককে প্রাণ দিতে না হয়। সভায় ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্সের সাধারণ সম্পাদক এবং আইবিসির নারীবিষয়ক সম্পাদক চায়না রহমান রানা প্লাজার মালিকসহ সংশ্লিষ্ট দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান। আইবিসির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কুতুবউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বক্তৃতা করেন।



