প্রধান খবরবাংলাদেশ

পৌষের অকাল বৃষ্টিতে তীব্র শীত, সারাদেশে জনজীবন বিপর্যস্ত

পৌষের শীতে সারা দেশে অকাল বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীসহ বেশির ভাগ জায়গায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। ঢাকায় শুক্রবার সকালটা ছিল বৃষ্টি ভেজা। মাঝখানে একটু রোদ। তারপর আবার আকাশ মেঘলা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে অনেকটা থেমে যায় জনজীবন।
 
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে দ্বীপজেলা ভোলায়।
 
রাজধানী ঢাকায় এ সময় ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ১৭ মিলিমিটার। এদিকে চট্টগ্রামে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে।
 
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। একদিকে দক্ষিণ মেরুতে বর্তমানে প্রচণ্ড দাবদাহ বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ পুড়ছে দাবানলে। অপরদিকে উত্তর মেরুর দেশগুলোতে চরম শীত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পাশের দেশ ভারতের নয়াদিল্লিতে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৯ ডিগ্রিতে নেমেছিল, যা গত একশ’ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এটা ছিল ১৯০১ সালের পর শীতলতম ডিসেম্বর। বাংলাদেশে ১৯৬০ সালের আগের তথ্য-উপাত্ত তেমনটা নেই। গত মাসে দেশে যে পরিমাণ শীত পড়েছিল তাতেও দিল্লির মতো রেকর্ড ভেঙেছে বলা যায়। এই বৃষ্টি এবং শীত পরিস্থিতি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
 
আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় এর মাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব কেটে গেলে শীত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আজও বৃষ্টির আভাস রয়েছে। এরপর শুরু হতে পারে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। আগামীকাল রোববার থেকে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।
 
জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চুয়াডাঙ্গা ও দামুড়হুদা : বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা থেকে শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সকাল পর্যন্ত ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এরপর শুক্রবার দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। শীত ও বৃষ্টির অসহনীয় মাত্রায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের হননি কেউ।
 
ভোলা ও বোরহানউদ্দিন : একদিকে নদী থেকে আসা গা হীম করা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস, অন্যদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। টানা তিন দিন সূর্যেরও দেখা নেই। এ অবস্থায় ভোলার বোরহানউদ্দিনের মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া প্রায় তিন হাজার ছিন্নমূল পরিবার ভয়াবহ শীতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের অবস্থা খুবই নাজুক। ইতিমধ্যেই শিশুদের নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া এবং বয়স্কদের হাঁপানি, সর্দি ও কাশির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এদিকে বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েন মানুষ। কৃষি বিভাগ জানায়, এমন বৃষ্টিতে শীতকালীন ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
 
সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) : বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরেছে সাটুরিয়ায়। একে তো শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপন্ন। তার ওপর বৃষ্টি শীতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে ধলেশ্বরী নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এদিকে অকাল বৃষ্টিতে সরিষাসহ শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষক।
 
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে জনজীবন। বাড়ে শীতের তীব্রতাও। দুপুরের পর সূর্য দেখা গেলেও পুনরায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নিু আয়ের লোকদের চরম দুর্ভোগ দেখা দেয়।
 
ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলেও রাতে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে থাকে। এরপর শুক্রবার সকাল থেকে অনেকটা মুষলধারায় বৃষ্টি ঝরেছে। এতে শীত বাড়ার পাশাপাশি শীতকালীন ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি ও শীতের কারণে রাস্তাঘাট-দোকানপাটগুলোতে লোক সমাগমও কম ছিল। ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপও বেড়েছে।
 
পটুয়াখালী (দ.) : ভোররাত থেকে অবিরাম বৃষ্টির ফলে শীতের তীব্রতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি দমকা বাতাসের ফলে উপকূলে আকস্মিক দুর্যোগের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-বৃদ্ধসহ নানা বয়সী মানুষ। স্থবির হয়েছে পড়েছে মানুষের কর্মচাঞ্চল্য।
 
সাতক্ষীরা : রাত থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে সাতক্ষীরার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি না পেলেও শুক্রবার দিনভর সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। ছিন্নমূল ও নিু আয়ের মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি পায়। শহরে যানবাহন চলাচল ছিল কম। বাজারঘাটেও কোনো ভিড় ছিল না।
 
বগুড়া : বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার সকালে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে শীতের তীব্রতার কমবেশি বা মাঠে থাকা ফসলেরও ক্ষতি হয়নি। স্থানীয় আবহাওয়া ও কৃষি অফিস সূত্র এটা নিশ্চিত করেছে। বগুড়া আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার নুরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পর রোদ ওঠায় তাপমাত্রা তেমন কমবেশি হয়নি।
 
শেরপুর : শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে শেরপুরে থেমে থেমে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কারণে জেলায় শীতের তাব্রতা বেড়েছে। অনেক স্থানে রাস্তাঘাটে পানি জমে যায়। আবার অনেক স্থানের রাস্তায় কাদাপানি একাকার হয়ে যাওয়ায় মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
 
বাগেরহাট : ভোর থেকে কখনও ভারি ও আবার কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টি আর শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বাগেরহাটের জনজীবন। পাশাপাশি হিমেল হওয়ার কারণে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। সকাল থেকেই লোকজন বাড়ি থেকে বের হতে পারেনি। প্রায় যানবাহনশূন্য ছিল রাস্তাঘাট। এমন অবস্থায় খেটে খাওয়া দিনমজুররা পড়েন চরম বিপাকে।
 
বরিশাল ও আগৈলঝাড়া : বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে শুক্রবার দিনভর ভারি বৃষ্টি হয়েছে। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় ৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। আজ দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলেও আভাস দেয়া হয়েছে। এদিকে বৃষ্টির কারণে চরম বিড়ম্বনার শিকার হন জনসাধারণ। এদিকে আগৈলঝাড়ায় ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension