
ট্রাম্প নয়, পকেটের চিন্তা!
ইরান যুদ্ধের অবসানও চান মার্কিন ভোটাররা, এপি-নরক জরিপ: ১০ জনে ৮ জনের অগ্রাধিকার জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ১০ জনে ৭ জন চান ইরান যুদ্ধের অবসান
শাহ্ জে. চৌধুরী
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের অগ্রাধিকারে উঠে এসেছে অর্থনৈতিক স্বস্তি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের অবসান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত কিংবা তাঁর কর্মসূচির প্রতি সমর্থনের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য কমানো এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মার্কিন ভোটাররা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের নতুন জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ চান, নতুন কংগ্রেসের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকুক জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চান, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো হোক। বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কংগ্রেসের মনোযোগ চান প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার।
দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে অর্থনৈতিক উদ্বেগ
জরিপের ফলাফল বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ শুধু একটি দলের সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের ভোটারদের কাছেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবারের আর্থিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
মিসিসিপির ব্রুকহেভেনের ৩১ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট জাস্টিন ক্যাম্পবেল এপিকে বলেছেন, সরকার যেন তাঁর মতো সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে মনোযোগ দেয়, শুধু ধনীদের স্বার্থে নয়। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন এক জনমতের প্রতিফলন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ৭১ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট আর্থার ব্রাউন মনে করেন, কংগ্রেসের উচিত অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং পণ্যমূল্য কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন থাকলেও তাঁর কাছে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এখন বেশি জরুরি।
ট্রাম্পের কর্মসূচি নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও পার্থক্য
রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সমর্থনের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা আন্দোলনের সমর্থকদের প্রায় ৬০ শতাংশ নতুন কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মসূচি বাস্তবায়নকে দেখতে চান। কিন্তু ম্যাগা আন্দোলনের সমর্থক নন—এমন রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ।
অর্থাৎ, রিপাবলিকান ভোটারদের একটি অংশ প্রেসিডেন্টের কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিলেও অন্য অংশের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ইরান যুদ্ধের অবসান এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও একই ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমর্থক ডেমোক্র্যাটদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তকে অগ্রাধিকার দিতে চান। অন্যদিকে, এই মতাদর্শের সমর্থক নন—এমন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ তুলনামূলক কম। মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি বড় অংশ দুই দলের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কংগ্রেসের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
জরিপে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং দুই দলের মধ্যে সমঝোতা তৈরির বিষয়কে প্রায় অর্ধেক ভোটার উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তকে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে রেখেছেন। ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে এ ধরনের অগ্রাধিকার দিয়েছেন প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার।
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস আগেই বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর নজরদারিকে অগ্রাধিকার দেবেন। তবে নির্বাচনের পর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যে দলের হাতেই থাকুক, ভোটারদের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা উপেক্ষা করা কঠিন হবে বলে জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৩ নভেম্বরের নির্বাচনে গুরুত্ব পাবে জনজীবনের প্রশ্ন
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে জরিপের ফলাফল নিজে থেকে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করে না।
৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ১,১১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের ওপর পরিচালিত এপি-নরক জরিপে সামগ্রিকভাবে নমুনাগত ত্রুটির সীমা ছিল প্রায় ৩.৯ শতাংশ পয়েন্ট। জরিপটি যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যে তৈরি আমেরিস্পিক প্যানেল থেকে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে পরিচালিত হয়।
জরিপের মূল বার্তা স্পষ্ট: রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ চান তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় কমুক, অর্থনীতি স্বস্তি দিক এবং ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটুক। নির্বাচনের আগে এই প্রত্যাশাগুলো নতুন কংগ্রেসের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।



