প্রধান খবরবাংলাদেশ

বর্ষবরণের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ আজ

পুরোনো বছরের গ্লানি, জীর্ণতা আর শোককে পেছনে ফেলে নতুন আশা ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজ শুরু হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পথচলা। ভোরের নতুন সূর্যের আলোয় সারা দেশে নব আনন্দে উদযাপিত হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ।

আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশে হালখাতার সেই পুরোনো জৌলুস কিছুটা কমলেও বাঙালির আত্মপরিচয় আর সম্প্রীতির এই উৎসবে যুক্ত হয়েছে বর্ণিল সব নতুন মাত্রা। ঋতুচক্রের আবর্তনে আসা এই দিনটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক মিলনমেলায় শামিল করেছে, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলা নববর্ষ আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক।

এটি আমাদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পয়লা বৈশাখ আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। তিনি বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে এই উৎসবের নিবিড় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও লোকজ কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

রাজধানী ঢাকায় বরাবরের মতোই বর্ষবরণের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রায় ‘শান্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তা’র প্রতীক হিসেবে মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়ার পাঁচটি বিশেষ মোটিফ স্থান পেয়েছে। রঙিন কাগজে নির্মিত বিশাল সব প্রতিকৃতি আর বাদ্যযন্ত্রের তালে মুখরিত এই শোভাযাত্রার মূল বার্তা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় আগামীর পথে যাত্রা।

এছাড়া রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা ‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’র প্রতিপাদ্যে সম্মিলিত কণ্ঠে গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও দিনভর তোপখানা রোডে গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব আয়োজনে বর্ষবরণ করছে।

শহরের জাঁকজমকের পাশাপাশি গ্রামবাংলাতেও বইছে উৎসবের হাওয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈশাখী মেলার পাশাপাশি বলিখেলা, লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডু’র মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ঐতিহাসিক জব্বারের বলিখেলা শত বছরের ঐতিহ্য বজায় রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে পুতুলনাট্য আর লোকজ মেলার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া আনন্দকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বর্ষবরণের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও র‍্যাব প্রতিটি উৎসবস্থলে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও তাদের সদস্যদের নিয়ে ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নববর্ষের এই প্রভাত আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে বাঙালির চিরন্তন ঐক্যের শক্তিকে, যেখানে নতুনের জয়গান আর মানবতার আহ্বানই হয়ে উঠেছে মুখ্য।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension