প্রধান খবরবাংলাদেশ

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি উত্তর জনপদের মহীয়সী নারী মাহেরীন চৌধুরী

মাহেরীন চৌধুরী উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছিলেন। সোমবার যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি অগ্নিদগ্ধ হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিজের জীবনের বিনিময়ে ২০ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন উত্তর জনপদের এই মহীয়সী নারী।

স্ত্রী মাহেরীন চৌধুরীর আত্মত্যাগের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বামী মনসুর হেলাল। স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তখন রাত ৮টা কি সোয়া ৮টা হবে। বার্ন ইউনিটে মাহেরীনের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। বললাম, তোমার বাচ্চা দুইটার দিকে তাকিয়ে যদি একটু স্বার্থপর হতে।

ও বলল, এরাও তো আমার বাচ্চা। এই যে তার মানসিকতা। সে একটু স্বার্থপর হলে আমাদের সন্তানদের এ অবস্থা হয় না। তার চিন্তা ভাবনা হয়তো অনেক উঁচু ছিল। তার যে শরীরের ভাষা, তাতে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তটাই সে নিয়েছে। সব সময় তার চিন্তা ছিল, যত দিন বেঁচে থাকি, সৎকর্ম করে দেশের মানুষের যেন একটু উপকার হয়, সে ধরনের কাজে যুক্ত থাকব। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার মধ্যে সব সময় কাজ করত।

মাহেরীন চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলা পৌর এলাকার বগুলাগাড়ি চৌধুরীপাড়ায়। তার বাবা প্রয়াত মহিতুর রহমান চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আপন খালাতো ভাই। চার ভাইবোনের সবার বড় ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী।

মঙ্গলবার বিকালে বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থান ‘আপন ঠিকানায়’ তাকে দাফন করা হয়।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাশ চলাকালে একটি ভবনে প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন ধরে যায় ভবনে। তখন চারপাশে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। মাহেরীন চৌধুরী তখন শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় তিনি অগ্নিদগ্ধ হন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রাত ১০টা ১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহতের স্বামী মনসুর হেলাল জানান, ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বের হওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ সময় মাহেরীন সামান্য আঘাত পায়; কিন্তু ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী ভেতরে আটকা পড়ে যায়। সে শিক্ষার্থী আটকা পড়ার বিষয়টি মোবাইলে আমাকে জানায় এবং তাদের উদ্ধারে ভেতরে ঢুকে পড়ে। শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের সময় সে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টার পর মারা যায়।

তিনি আরও জানান, মাহেরীনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীরই ঝলসে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা ৮০ ভাগ দগ্ধের কথা বললেও তার মনে হয়েছিল তিনি শতভাগ দগ্ধ হয়েছেন। তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার আগেও তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন। অবশেষে রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি দুটি সন্তান রেখে গেছেন।

মাহেরীন চৌধুরীর বাড়িতে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে আসেন বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহুবার রহমান বলেন, দুর্ঘটনার এক ঘণ্টা আগেও মাহেরীন চৌধুরীর সঙ্গে তার ই-মেইল আদান-প্রদান হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল মাহেরীন চৌধুরী এই প্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি প্রায় প্রতিদিনই মুঠোফোনে প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নিতেন। ২২ জুন তিনি কলেজের একটি সভায় অংশ নেন। আগামী ২৮ জুলাই কলেজের অভিভাবক সভা ও কলেজের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার জন্য তার আসার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল (২১ জুলাই) কল দিয়ে বলেন, পরের মাসে আসবেন। তারা যেন ২৮ জুলাই সভাটি করে নেন। এর কিছু সময় পর তারা দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু খবর পান।

এলাকার মানুষের প্রতি তার মায়া মহব্বত ছিল। তিনি নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, এটা বিশ্ববাসীর কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মুশফিকুজ্জামান জানান, যেখানে আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, এ রকম একটি সময়ে এসে মাহেরীন চৌধুরী নিজের জীবনকে পরোয়া করেননি। উনি যে শিক্ষা রেখে গেলেন, এটা সারা বিশ্বের জন্য একটা দৃষ্টান্ত।

মাহেরীনের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিমানবাহিনী প্রধান, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সভানেত্রী বেগম আফরোজা আব্বাস, নীলফামারী জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার প্রমুখ।

অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে স্বামী মনসুর হেলাল বলেন, তারা দুজনই ছিলেন ঢাকার শাহীন স্কুলের শিক্ষার্থী। ১৯৯২ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। এরপর ২০০৮ সালে তারা বিয়ে করেন। আমার সহধর্মিণী মাহেরীন চৌধুরীকে যতটুকু চিনি ও জানি, সে মোরালি স্ট্রং একজন লেডি ছিল। তার চিন্তাচেতনা, ধ্যান ধারণা সবকিছুতে দৃঢ়তা ছিল। সে গত ১৭ বছর যাবৎ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকরি করেছে। শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে পরে সে তার যোগ্যতা অনুসারে বিদ্যালয় শাখার কো-অর্ডিনেটর হয়।

ওই দিনের ঘটনা বর্ণনা করে মনসুর হেলাল বলেন, আমার ভাবিও মাইলস্টোনে চাকরি করেন। তিনি ফোন করে জানান, মাহেরীন যে শ্রেণির কো-অর্ডিনেটর, সেখানে একটি বিমান ক্রাশ করেছে। আমার বড় ছেলে আয়ানকে ফোন করে বলি। ছেলে যাওয়ার মাঝপথে জানতে পারে, তার মাকে উত্তরার বাংলাদেশ আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে তার মাকে পায়নি। পরে অ্যাম্বুলেন্স থেকে জানানো হয়, ওকে বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাচ্ছে।

বার্ন ইউনিটের পাঁচতলায় গিয়ে মাহেরীন চৌধুরীকে পায় বলে জানান মনসুর হেলাল। তিনি বলেন, দেখলাম মাহেরীনের পা থেকে মাথা, চুল পর্যন্ত পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। সে আমাকে দেখার পরে বলে, তুমি আসছো। আমি বললাম, আসছি। মাহেরীন বলে, আমি থাকব না। আমাকে তুমি আমার বাবা-মায়ের কাছে নিয়ে যাও।

এরপর স্তব্ধ হলো। আমরা সবাই মিলে আইসিইউতে নিয়ে গেলাম।

‘আমি আর বেশিক্ষণ নেই’ বলে আমার ডান হাত শক্ত করে ধরে তার বুকের ওপর রেখে বলল, ‘আমি চলে যাচ্ছি, জীবনে তোমার সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না।’

স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথোপকথনের ঘটনা জানিয়ে মনসুর হেলাল বলেন, আরেকটা জিনিস সে চেয়েছিল, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমাকে কিছু খাবার দাও।’ শুধু তিন ফোঁটা পানি দিতে পেরেছিলাম। অন্য কোনো খাবার তাকে দিতে পারি নাই। চিকিৎসক বলেছিলেন, কিছু খেতে দিলে শ্বাসনালীতে আটকে যেতে পারে। এই কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমি তার মুখে কিছু দিতে পারি নাই।

স্বামী মনসুর হেলালের চাওয়া, রাষ্ট্র যেন মাহেরীনের আত্মত্যাগের মূল্য দেয়।

মনসুর হেলাল বলেন, সার্বিকভাবে একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, আমাদের দিকে তাকিয়ে যদি সে স্বার্থপর হতো, তাহলে জিনিসটা হয়তো অন্য রকম হতো; কিন্তু তার নিজের চিন্তাচেতনা থেকে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামনে কী হবে, ভবিষ্যৎ কী হবে-এসব সে বিবেচনায় নেয়নি। তার যে আত্মত্যাগ ও নৈতিক সাহস দেখিয়ে গেছে, রাষ্ট্র যেন তাকে সম্মান জানায়, এটাই আমার চাওয়া।

মাহেরীন চৌধুরীর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন- ‘ঢাকা শহরে একটি স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর জানার পর বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু। শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।’

তিনি আরও লিখেন, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী-একজন শিক্ষক, যিনি দ্রুত তার শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে আরও শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে সাহসিকতার সঙ্গে ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যেই ফিরে যান তিনি। তার অসাধারণ সাহস চিরকাল স্মরণে থাকবে।

মাহেরীন চৌধুরীর দুই ছেলে। বড় ছেলে মিয়াত চৌধুরী দশম শ্রেণিতে পড়ে আর সাইফ চৌধুরী ছোট। স্বামী মনসুর হেলাল প্রাইড গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক। মাহেরীন চৌধুরীর বাবা মহিতুর রহমান চৌধুরী ২০১৪ সালে এবং ২০২০ সালে মা ছাবেরা চৌধুরীর মৃত্যু হয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension