
নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলার ৩৫ বছর আশা ও আশঙ্কা
তোফাজ্জল লিটন
পরিষ্কার নীল আকাশের নিচে বড় বড় সবুজ গাছের সারি, তার ডাল-পল্লবে ঘেরা ছায়াঘন একটা চত্বর। জমিদার বাড়ির আদলে ইটের নকশায় তৈরি শৈল্পিক স্থাপত্যের সুউচ্চ ভবন। সামনের সবুজ জমিনজুড়ে বাংলাদেশের নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কর্মীরা নতুন-পুরোনো বই সাজিয়ে বসে আছেন। শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা শত শত পাঠক, লেখক-সংস্কৃতিকর্মী ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ বই কিনছেন, কেউ প্রিয় লেখকের সঙ্গে ছবি তুলছেন। অদূরে ঘাসের ওপর আড্ডা জমেছে কয়েকটা দলের। বিকেলের আলো নরম হয়ে এলে বাংলা গানের সুর ভেসে আসে। পাশে একতারা, দোতারা, হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি, করতাল, ঢোল বিক্রি করছেন খান ভাই। চা-সিঙ্গারা, মুড়ি-ছোলা আর টক-ঝাল — নানা স্বাদের পিঠার সুবাস মিশে যায় বইয়ের নতুন পাতার গন্ধে। রঙিন ফেস্টুনে সাজানো প্রাঙ্গণে লেখা থাকে বই পড়ার আহ্বান—বই হোক বিশ্ববাঙালির মিলনসেতু। পাঠক বুঝতে পারছেন এটা একটা বইমেলা। কেউ কেউ ঢাকার বর্ধমান হাউসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অমর একুশে গ্রন্থমেলার কথা ভাববেন। চিত্রটি নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার গত কয়েক বছরের চিত্র।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ৩৫ বছর ধরে নিউইয়র্কে বাংলা বইমেলার আয়োজন করে আসছে। আয়োজনের দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এই মেলার স্থান বাংলাদেশের একুশে বইমেলা ও কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলার পর। বইমেলা হলেও এ আয়োজন বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি-মনস্ক মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। ২০২২ সালের আগে মেলা হতো চার দেয়ালের ভেতরে। মেলাটি বাইরে বেরিয়ে এল ৩০ বছর পেরিয়ে, ২০২২ সালে। ৩১তম মেলা বসল জামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের খোলা প্রাঙ্গণে। অনুষ্ঠানগুলো জায়গা করে নিল সেন্টারের সুউচ্চ লাল ভবনে। আগামী ২২ মে শুরু হতে যাচ্ছে চারদিনব্যাপী ৩৫তম বইমেলা।
এই বইমেলার একটা বড় দিক লেখক ও পাঠকের অংশগ্রহণ। ঢাকা থেকে যেসব প্রকাশক অংশ নেন, তাদের কেউ কেউ নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ করেন। সমসাময়িক খ্যাতিমান আর গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহ এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গত ৩৪ বছরে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান লেখক এই মেলায় এসছেন বা অন্যভাবে যুক্ত থেকেছেন। উল্লেখ করা যায়,
২০০১ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন একযোগে বইমেলা উদ্বোধন করেছিলেন।
বাংলাদেশের পথিকৃৎ প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে সীমিত আকারে যে বইমেলা শুরু হয়েছিল, সেটি পরে অমর একুশে বইমেলায় রূপান্তরিত হয়, যা এখন পৃথিবীব্যাপী বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। বাঙালি আজ বিশ্বের নানা প্রন্তে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সব জায়গায় বাঙালি আছে – কথাটা বোঝাতে বিচারপ্রতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, বাংলা সূর্য অস্ত যায় না।
নিউইয়র্ক বাংলা বাংলা বইমেলা শুরু হয়েছিল
নিউ ইয়র্কে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ সাহার ব্যক্তিগত উদ্যোগে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বইমেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব বিশ্বজিত সাহা নিজেই পালন করে যাচ্ছেন । সবকিছু উত্রিয়ে এটা বাঙালি জনসমাজের বইমেলা হয়ে উঠে। প্রবাসী বাঙালি সমাজের এক সামষ্টিক পরিচয়চিহ্ন এই বইমেলা। যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি শহরে এবং ইউরোপের কয়েকটি শহরেও এখন বাংলা বইমেলা হচ্ছে। এসবের অনুপ্রেরণা নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলা।
নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলা ৩৫ বছর পার করেছে, এর ব্যাপ্তি বেড়েছে, বেড়েছে লেখক প্রকাশক পাঠকের সম্পৃক্ততা। নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিধা – এখন এটি নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে কিছু জিজ্ঞাসা কিছু সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। যেমন বাংলাদেশের প্রকাশক-লেখক এবং অন্য দুই একটি দেশের কয়েকজন বাঙালি লেখককে অতিথি হিসেবে নিয়ে আসা হতো, এখনও তেমনই হচ্ছে। মেলাটির নামে আন্তর্জাতিক শব্দটি যুক্ত হয়েছে, কিন্তু আয়োজনটাকে ঠিক আন্তর্জাতিক করে তোলা যায়নি। বইমেলার সময় বলা হয়, বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী নিউইয়র্কে আয়োজিত এই বাংলা বইমেলা বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষীদের বাইরে অন্য ভাষাভাষী বা অন্য কোনো দেশের লেখক-পাঠককে মেলায় চোখে পড়ে না। অতিথি হিসেবে কখনো কখনো দু-একজন বিদেশি এসেছেন, কিন্তু তার কোনো অভিঘাত মেলায় পড়েনি। এটা ধারাবাহিক যেমন নয় তেমনি বিদেশি লেখক-পাঠকের উপস্থিতি বইমেলার মতো একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনকে যে বৈচিত্র্য দেয়, নিউ ইয়র্ক বইমেলা সেটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রধানত বাংলাদেশের প্রকাশক ও লেখক মেলায় অংশ নেন। পশ্চিম বঙ্গের দু-চারটে প্র্রকাশক থাকেন বা তারা আসেন না, বই পাঠিয়ে দেন। পশ্চিম বঙ্গের কয়েকজন লেখক আসেন মেলায়। যুগব্যাপী এটা চলছে। অন্য ভাষাভাষী লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিকর্মীদের যুক্ত করা গেলে এই আয়োজন ক্রমশ আর পাঁচটা প্রথাগত নতুনত্বহীন অনুষ্ঠানের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
এ বইমেলায় প্রতিবছর মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দুটি পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১. চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার। ২. মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার। চিত্তরঞ্জন সাহার নামে প্রকাশনা পুরস্কার প্রবর্তন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা দেখলে বোঝা যায় না কোন মানদণ্ডে বা কিসের ভিত্তিতে সেরা প্রকাশক নির্ধারণ করা হয়, তা বোঝা যায় না। ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার’ — এখানে ‘জিএফবি’ মানে গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, যিনি এই বইমেলার একজন পৃষ্ঠপোষক। প্রশ্ন উঠেছে, সাহিত্য পুরস্কারটি একজন ব্যবসায়ীর নামে কেন। অন্যদিকে কিসের ভিত্তিতে এ পুরস্কার দেওয়া হয় তা স্পষ্ট নয়। প্রকাশ্য ও স্বাধীন জুরি বোর্ড, নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থাকলে পুরস্কার দাদা ও গ্রহীতা উভয়ের মর্যাদা বাড়ত।
অভিবাসী বাঙালি সমাজের শিশু-কিশোররা এই বইমেলায় যুক্ত হয়েছে মূলত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া, বই পড়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। যেসব শিশুকিশোর গান গায়, নাচে, আবৃত্তি করে তারা এ উৎসবের ঠিক অংশ হয়ে ওঠে না। নানা বিষয়ে আলোচনা, কবিতা পাঠ কিংবা খ্যাতিমান লেখক ও চিন্তাবিদদের যেসব অধিবেশন হয় সেগুলোর সঙ্গে এই শিশু-কিশোর-তরুণদের কোনো সংযোগই তৈরি হয় না। নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলায় এই দুই অংশকে মেলানো দরকার। তা না হলে এক দশক পর এ মেলার জন্য কর্মী পাওয়া কঠিন হবে।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কার্যনির্বাহী কমিটি এবং বইমেলার আহ্বায়ক কমিটি মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন ব্যক্তি এই বইমেলা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য কাজ করছেন। এদের নাম নানা জায়গায় দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকজন রাতদিন পরিশ্রম করেন, বাকিদের প্রধান কাজ কয়েকজনের বক্তব্য ও প্রস্তাবে সহমত হওয়া ও সম্মতিপ্রকাশ করা। এদের মধ্যে প্রধান প্রধান পৃষ্ঠপোষক থাকেন। স্বস্ত্রীক অনেকেই আছেন কমিটিতে। সক্রিয় ভূমিকা থাকলে একই পরিবারের একাধিক সদস্য কমিটিতে থাকতে পারেন। কিন্তু স্ত্রী কাজ করছেন বলে স্বামীর নামও যোগ করা বা স্বামী কাজ করছেন বলে কমিটিতে তার স্ত্রীর নাম রাখা – এগুলো বাহুল্য।
বইমেলায় মঞ্চে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু মুখ দেখা যায়। এটি কততম আসরের অনুষ্ঠান, কত সালের ছবি, তা উল্লেখ না করে কয়েক বছরের ছবি দেখলে, অনেক সময় একই বছরের ছবি বলে মনে হবে। নতুন মুখ, নতুন চিন্তা এবং নতুন সাংস্কৃতিক শক্তি যুক্ত না হলে এ আয়োজনকে প্রাণবন্ত করা যাবে না, উৎসবটিকে টিকিয়ে রাখাও কঠিন হবে।
গত বছর, ২০২৫-এ এ বইমেলার সঙ্গে যুক্ত একদল কর্মী বেরিয়ে যান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত বইমেলার দিনেই তারা ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’ নামে আরেকটি বইমেলার আয়োজন করেন। দুটো বইমেলা হওয়া মানে প্রকাশক পাঠক ক্রেতাদেরও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া। নিউ ইয়র্ক বইমেলায় অনেক বই বিক্রি হয় তা নয়। ১০০ টাকার বই ৪-৫ ডলারে বিক্রি হয় বলে কোনো কোনো প্রকাশক বিমান ভাড়া তুলতে পারেন। ২০২৫-এ দুটো মেলা হওয়ার ফলে সেই বিক্রিও কমে গেছে। ঢাকা থেকে আসা প্রকাশকেরা পড়েছেন বিবাকে। এবারও দুটি বেইমেলা হবে, মে মাসে। তবে ২০২৫-এর মতো একই দিনে হবে না।
বইমেলায় মঞ্চে আয়োজিত সাহিত্য বিষয়ক পর্বগুলোর অধিকাংশই নিষ্প্রাণ। দর্শক থাকেন ১৫ থেকে ২৫ জন। বিরল ক্ষেত্রে ৫০ জনের মতো দর্শক দেখা গেছে। মিলনায়তনের আসন আছে অন্তত চার শতাধিক। সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ সময় দেখা গেছে দর্শকের চেয়ে মঞ্চেই উপস্থিতি বেশি। অগোছাল অনুষ্ঠান, বৈচিত্র্যের অভাব এর কারণ। এসব অনুষ্ঠান অর্থাৎ সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠ –- এসবকে আয়োজনে যারা অংশ নেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা সে বিষয়ে যথেষ্ট জানেন না। দুএকজনকে বাদ দিলে এদের মধ্যে রুচি ও প্রজ্ঞার অভাব চোখে পড়ে। একজন কবি কবিতা পড়তে উঠে কবিতাই পড়বেন। এখানে দেখা যাবে তিনি নিজের কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করছেন। এসব ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় গলদ থাকে, যে বিষয়ে অধিবেশন হচ্ছে অনুষ্ঠানকে সে বিষয়ের মধ্যে রাখাটা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা আয়োজকরা উপলব্ধি করবেন আশা করি।
পৃথিবীজুড়ে বইয়ের পাঠক আর কাগজের বই কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় নিউ ইয়র্কে ৩৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে একটি বাংলা বইমেলা করে যাওয়া মোটেই সহজ নয়। এ কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত প্রশংসা তাদের প্রাপ্য। প্রবাসের এই বইমেলার মূল প্রেরণা ঢাকায় আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা থেকেই এসেছে। অমর একুশে বইমেলা একটি রাষ্ট্রীয় আয়োজন। আমেরিকায়, যেখানে সময় মানেই অর্থ, সুযোগও অবারিত, সেখানে প্রবাসীরা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এই আয়োজন টিকিয়ে রেখেছেন বছরের পর বছর। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ আয়োজনের আরও ব্যাপক, আরও অংশগ্রহণমূলক এবং প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, শিশু-কিশোর-তরুণদের আরো বেশি যুক্ত ও সম্পৃক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ। বাংলাদেশ সরকারে কিছু পৃষ্ঠপোষকতাও এই মেলার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তোফাজ্জল লিটন : নাট্যকার। নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলো এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি, একাত্তর টেলিভিশন, প্রচার সম্পাদক, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন।



