আন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্র

‘অজান্তে সত্য প্রকাশ’, ভারতের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয় : রুশ দূত

যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আরেকটি চীনে পরিণত হতে দেবে না বলে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন—এমন দাবি করেছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। তার মতে, এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এমন একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে দিতে চায় না।

এনডিটিভি জানায়, আলিপভ এই মন্তব্যকে ‘অজান্তে সত্য প্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রবিবার এনডিটিভির প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। তার দাবি, চলতি বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ওই মন্তব্য করেছিলেন। আলিপভ বলেন, তার মনে আছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ভারতকে পরবর্তী চীনে পরিণত হতে দেবে না।

’ তিনি বলেন, এখানে ‘পরবর্তী চীন’ বলতে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে চীনকে বোঝানো হয়েছে।

রুশ রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভারত যত শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসবে, যুক্তরাষ্ট্র তত বেশি ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে পারে। তিনি বলেন, ভারত একটি পরাশক্তিতে পরিণত হবে—এটি তার মতে অনিবার্য। আর ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে।

আলিপভ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইন, ২০২৬’-এর কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আইনে সই করেছেন। আইনটির মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারত এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আলিপভ মার্কিন নীতির সমালোচনা করেন। আলিপভ বলেন, ভারত রাশিয়ার স্বার্থে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনে না। বরং ভারতের নিজের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থেই রাশিয়ার তেল কেনা হয়। এনডিটিভিকে তিনি বলেন, রাশিয়ার তেল প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যায়। তাই ভারত নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই তেল কিনছে। তার মতে, রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে ভারত যে অবস্থান নিয়েছে, তা দেশটির কৌশলগত স্বাধীনতার পরিচয়।

আলিপভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই আইনের মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করার কথা বলছে। তার মতে, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অজানা নয়। তিনি বলেন, ভারত যত এগিয়ে যাবে, দেশটির ওপর এ ধরনের চাপ ও কৌশল অব্যাহত থাকতে পারে। ভবিষ্যতে এই চাপ আরো বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরনো। ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া সেই সম্পর্ক ধরে রাখে। দুই দেশের দীর্ঘ সম্পর্ক নিয়ে আলিপভ বলেন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানই এই সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। তিনি বলেন, যাদের ওপর আস্থা রাখা যায় না, তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তার মতে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একবার দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

আলিপভ বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকেই ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক চলে আসছে। আগামী বছর দুই দেশ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করবে। রুশ রাষ্ট্রদূতের মতে, কয়েক দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক টিকে আছে। তিনি বলেন, এর একটি কারণ হলো—দুই দেশ তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল করেনি। তার মতে, এই সম্পর্ক শুধু রাশিয়ার জন্য ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্ব নয়; ভারতও রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। তিনি আরো বলেন, দুই দেশ কখনোই নিজেদের সম্পর্ককে এমনভাবে দেখেনি যে একজনের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি।

রুশ রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, বছরের পর বছর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থন দুই দেশের সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। এই ভিত্তির ওপর ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথাও তুলে ধরেন আলিপভ। ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ও মোদি বৈঠক করেন।

আলিপভ বলেন, ওই বৈঠকসহ ব্রিকস সম্মেলনের বিভিন্ন আলোচনা দেখিয়েছে যে রাশিয়া ও ভারতসহ সংগঠনটির সদস্য দেশগুলো বিশ্বরাজনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। তার মতে, ব্রিকসের দেশগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী ভূমিকা চায়। একই সঙ্গে তারা এমন একটি বিকল্প আলোচনার প্ল্যাটফর্ম চায়, যেখানে সব দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। আলিপভ বলেন, ভারত ও অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে রাশিয়াও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিভিন্ন দেশের মতামত গুরুত্ব পাবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension