
মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দিনই এক অনলাইন সভায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকরা একমত হয়েছিলেন যে পরদিন অর্থাৎ ৪ জানুয়ারি এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে। কিন্তু গত ৩ জানুয়ারি রাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে রাতারাতি পরিস্থিতি জটিল করে ফেলেন। সেদিনই তিনি নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ দলের ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া উচিত হবে না বলে নিজে থেকে রায় দিয়ে দেন। তাতে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেও নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থাকা আসিফ নজরুল গত ২২ জানুয়ারি এক পাঁচতারা হোটেলে বিশ্বকাপ দলের ক্রিকেটারদের ডেকে ভারতে না যাওয়ার নানা যুক্তি তুলে অথচ এর ৯ দিন আগেই অর্থাৎ ১৩ জানুয়ারি তিনি ভারতে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন বিসিবিকে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব-উল আলম স্বাক্ষরিত সেই চিঠি কালের কণ্ঠের হাতেও এসেছে; যেখানে ভারতে না যাওয়ার ‘কঠোর নির্দেশনা’ প্রদান করার পাশাপাশি ভারত ছাড়া অন্য কোথাও খেলতে গেলেই কেবল সরকারের সহায়তা মিলবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের মহাক্ষমতাধর উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ‘হুকুম তামিল’ করতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদও বিকল্প ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় খেলার জন্য গোঁ ধরে থাকে। সেই সঙ্গে আইসিসির অন্য সদস্য দেশগুলোকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে তাঁদের কূটনৈতিক ব্যর্থতায় নিজেদের ইতিহাসে এই প্রথম একটি বিশ্বকাপ বিসর্জন দেয় বাংলাদেশ। রীতিমতো ভোটাভুটির আয়োজন করে তাদের বাদ দেয় আইসিসি।
ভোটে বিপুল ব্যবধানে হারা বাংলাদেশ বিশ্বকাপের অংশ হয়েও শেষ পর্যন্ত শুধুই দর্শক বনে যায়। এভাবে একটি বিশ্বকাপ ‘বলি’ দেওয়ার জন্য অনেকেই এখন কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে আসিফ নজরুলকে। সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিবির বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবালকে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে তুমুল বিতর্কিত বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামও এঁদের অন্যতম। বিশ্বকাপ ইস্যুতে বাংলাদেশ দ্রুতই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন তামিম।
সে জন্য তাঁর ওপর চড়াও হওয়া আমিনুলের ভেঙে দেওয়া বোর্ডের পরিচালক নাজমুলই এখন বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না যাওয়ার একক দায় দিচ্ছেন সাবেক আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টাকে, ‘তখন যদি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া থাকতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কারণ আসিফ নজরুল সাহেব ব্যক্তিগতভাবে একটু একরোখা মানুষ। আমার মনে হয়, সবাই এটা জানে। আসিফ নজরুল যেটা বলেন, তিনি ওটাতেই অটল থাকতে চান। তিনি আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলার আগেই ফেসবুকে নিজের বক্তব্য দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।
এমনকি এর পরের দিন বা তার পরের দিনও তিনি আরেকটা বক্তব্য দেন। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা যুক্তি দেখিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পেছনে কাজ করেছেন।’
বিশ্বকাপ খেলতে কোনোভাবেই বাংলাদেশ দলকে ভারতে যেতে না দেওয়ার যে মনোভাব ছিল আসিফ নজরুলের, তার পেছনে অন্য উদ্দেশ্যও দেখেছেন বিসিবির সাবেক পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম, ‘সরকারের ভেতরে থাকা কোনো ব্যক্তি হয়তো বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে এই মনোভাব পোষণ করেছেন বা ব্যক্তিস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ এর যোগসূত্র খুঁজতে ২০২৫ সালের ১৪ জুনের বিকেলেও ফিরে যাওয়া যেতে পারে। সেদিন জাতীয় স্টেডিয়ামে বিদেশি কূটনীতিকদের বিপক্ষে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ খেলে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘টিম অ্যাডভাইজারস’। তখন আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ফুটবলকে উঁচুতে তুলে ধরতে গিয়ে ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্য একটি দেশের প্রতি বিদ্বেষও লুকাননি তিনি, ‘ফুটবল আমাদের লাইফলাইন। অন্য দেশের হেজেমনি প্রতিষ্ঠার জন্য ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে ফুটবলকে প্রায় মেরে ফেলা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত ফুটবলপ্রেমী।’ ওই বক্তব্য যে স্রেফ কথার কথা ছিল না, বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর পরবর্তী কর্মকাণ্ডকেই এর প্রমাণ ধরছেন ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে নতুন সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও কিছুতেই মানতে পারছেন না যে বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আসরে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই সিদ্ধান্ত নিতে বিসিবিকে বাধ্য করেছেন নাকি দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার নিজেদেরও দায় আছে? বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলেও তা মীমাংসিত নয় এখনো। ওই টুর্নামেন্টে খেলা দলগুলো আরেকটি বিশ্বকাপের প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশও ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত। কিন্তু লিটন দাসদের ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও। গত ১৭ মার্চ তাই জানিয়েছিলেন যে এর তদন্ত করবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এমন ঘোষণার পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তকাজ শুরু করতে না পারায় আক্ষেপ তাঁর। ক্রীড়া ভাতা কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় স্বাধীন তদন্ত কমিটি তৈরি করতে পারেননি আমিনুল। খুব দ্রুত মূল কারণ বেরিয়ে আসবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপে আমিনুল বলেছেন, ‘বিসিবির নির্বাচন নিয়ে যেমন অস্বচ্ছতার তদন্ত হয়েছে, আমি চাই এই বিষয়টা নিয়েও যেন তেমনটি হয়। আপনারা জানেন, ক্রীড়া কার্ড নিয়ে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠগুলো যেন দ্রুত খেলার উপযোগী করা যায়, এ জন্য সম্প্রতি খুব ব্যস্ত সময় কাটছে আমার। একটু ফ্রি হলে তদন্ত কমিটি তৈরিতে কাজ শুরু করব। সেটা খুব দ্রুতই দেখবেন। স্বাধীন একটা তদন্তদল কাজ করবে। আমরাও চাই, বিশ্বকাপে না যাওয়ার আসল কারণটি বেরিয়ে আসুক। কারা দোষী, সাজা কী হবে, এসব নিয়ে এখনই ভাবছি না। আগে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি প্রকৃত ঘটনা যাচাই করবে।’ ভবিষ্যতে যাতে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে খেলতে না যাওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে, এ জন্য আগের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি বলেও মনে করেন আমিনুল হক, ‘আমরা এই কাজটি করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারের সময়ই এমন ঘটনা আর না ঘটে। দেশের ক্রীড়াঙ্গন থাকবে সবকিছুর ওপর। এখানে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ থাকবে না। আমরা চাই না, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কারো স্বার্থে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক। আগামী দিনের কথা চিন্তা করে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে যেন এমন কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাক্ষী হতে না হয়, এ জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার কারণ খোঁজা প্রয়োজন।’
ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করার আগে এখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আসিফ নজরুলের জেদের বলি হয়েছে দেশের ক্রিকেট। বিসিবির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের আরেকজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন এভাবে, ‘মুস্তাফিজকে (রহমান) আইপিএল থেকে প্রত্যাহার করার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘটনাগুলো সাজালেই তো সব পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে কার ইশারায় কী হয়েছিল। সে সময় আমাদের কথা কেউই শোনেননি। আসিফ নজরুলের কথায় বিশ্বকাপ খেলতে না চাওয়া চরম মাত্রার বোকামি ছিল।’ সব ঘটনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে কালের কণ্ঠ। গত ৩ জানুয়ারি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) পরামর্শে মুস্তাফিজকে ‘রিলিজ’ করে দেয় আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) খেলা দেখতে এবং আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার কার্যক্রম উদ্বোধন করতে সেদিন সিলেটে ছিলেন তখনকার বিসিবি সভাপতি আমিনুলসহ বেশ কয়েকজন পরিচালক। সেখান থেকেই রাতে জরুরি অনলাইন সভা ডাকেন তিনি। সেদিন কী কথা হয় পরিচালকদের? তখনকার ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান ফাইয়াজুর রহমান শোনালেন কিছু অংশ, ‘আমরা বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার জন্য খুব উদগ্রীব ছিলাম। আমাদের সেই জরুরি অনলাইন (জুম) সভায় যখন বিষয়টি উঠল, তখন প্রশ্ন ছিল, আমাদের এখন করণীয় কী। সেখানে আমি আইসিসির সঙ্গে প্রাথমিকভাবে চুক্তির কিছু শর্ত জানতে চেয়েছিলাম। খেলতে না গেলে আমাদের কোনো আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা কোনো নিষেধাজ্ঞা বা জরিমানার মুখে পড়তে হবে কি না।’
অথচ ওই বৈঠকের আগে বোর্ডের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা হয় যে পরদিন সন্ধ্যায় আইসিসিকে একটি চিঠি দেবে বিসিবি। যেখানে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া এবং ভারতে বাংলাদেশ দলের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার হুমকির শঙ্কার কথা জানিয়ে ক্রিকেটের এই সর্বোচ্চ সংস্থার হাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেদিন রাতেই আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট শেয়ার করে সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দেন, ‘ক্রিকেট বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিমের বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি। আমি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি, বাংলাদেশ আইপিএল খেলার সম্প্রচারও যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়!’ তাঁর এই স্ট্যাটাসের পরই সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে দাবি আরেকজন পরিচালকের, ‘আসিফ নজরুল সাহেব এটা প্রচার করেই সবকিছু জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেন। তিনি হুট করে সিদ্ধান্ত নিলেন, দেশে আইপিএল নিষিদ্ধ করতে হবে। পরিস্থিতি তখনই ঘোলাটে হতে শুরু করল। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক হিসেবে তাঁর উচিত ছিল সবকিছু আরো ভালোভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অপরিপক্ব কাজ করেছেন তিনি।’ সাবেক পরিচালক ও আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার রহমানও তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টাকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার জন্য দায়ী করেন, ‘অবশ্যই আমি এটাকে ইমম্যাচিউরিটির হাই অর্ডার (অত্যন্ত অপরিণত) বলব। উনি তো আমাদের কোনো রকম সময় দেননি। পরামর্শ করার আগেই অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।’ যাঁর বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগ, সেই আসিফ নজরুলের মন্তব্য জানতে তিন দিন ধরে তাঁর ফোনে লাগাতার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়বস্তু জানিয়ে টেক্সট পাঠিয়েও মেলেনি কোনো জবাব। ৩ জানুয়ারি রাতে ক্রীড়া উপদেষ্টার ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর ৪ জানুয়ারি আইসিসিকে চিঠি না পাঠিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসেন বিসিবির পরিচালকরা। তবে আগে বিসিসিআইকে চিঠি না দিয়ে আইসিসিকে দেওয়ার সিদ্ধান্তেও অপরিপক্বতা আছে বলে মনে করেন ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তা ছাড়া আমিনুল ইসলাম বুলবুলের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পরে পদত্যাগ করা ফাইয়াজুর ৪ জানুয়ারির সভা থেকে অন্য কিছুর আভাসও পেয়েছিলেন, ‘সভাটি সবার মতামত জানতে চাওয়ার জন্য হলেও কয়েকজন আগে থেকেই হয়তো অনেক কিছু জানতেন। সেদিন প্রাথমিক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো যে আমরা খেলার স্থান (ভেন্যু) পরিবর্তনের দাবি জানাব। স্থান পরিবর্তন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একজন পরিচালক জানালেন যে সরকার যদি অনুমতি (জিও) না দেয়, তবে আমরা যেতে পারব না। আরেকজন জানালেন, এখানে সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতিও দেখতে হবে। আমাকে সব বিষয়ে ওভাবে সম্পৃক্ত করা হতো না, যাঁরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন, তাঁরাই এগুলো দেখভাল করেছেন। তবে আমরা বেশির ভাগ পরিচালক খেলতে যাওয়ার পক্ষে ছিলাম।’
৩-৪ জানুয়ারির ঘটনাপ্রবাহের পর ১৩ জানুয়ারি বিসিবিকে চিঠি (স্মারক নাম্বার ৩৪.০০.০০০০.০০০.০৭১.৩৩.০০০১.১৭.৫৭) দিয়ে ভারতে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এই বিভাগের সচিব মাহবুব উল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আইসিসিকে প্রস্তাব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ‘ভারতে অনুষ্ঠেয় আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণসংক্রান্ত পরামর্শ’ শিরোনামে চিঠিটিতে লেখা ছিল, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ভারতে আইপিএল থেকে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়ার পর থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি এই কারণে সৃষ্টি হয়েছে যে ধর্মীয় উগ্রবাদ দ্বারা প্রভাবিত হুমকি থেকে একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ধর্মীয় উগ্রপন্থী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে ভারতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিসিসিআই সক্ষম নয়। উপলব্ধ তথ্য, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকার মনে করে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, অনুমোদিত কর্মী ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই। অতএব, সরকার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দিচ্ছে যে আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অংশ হিসেবে ভারতে নির্ধারিত ম্যাচগুলোতে অংশগ্রহণ বা ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে। একই সঙ্গে সরকার বিসিবিকে পরামর্শ দিচ্ছে যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের জন্য আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করতে। সরকার এমন শর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে সমর্থন করে, যেখানে দেশের প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয় এবং আয়োজকদের পক্ষ থেকে ভারতের বাইরে বিকল্প ভেন্যু প্রস্তাব করা হলে বোর্ডকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।’
অর্থাৎ এই চিঠির পর অনেকটাই পরিষ্কার যে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের, বিশেষ করে আসিফ নজরুলের। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন পর্যন্তও ক্রিকেটারদের কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ জানার প্রয়োজন মনে করেনি মন্ত্রণালয় ও বিসিবি। আনুষ্ঠানিকভাবে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ৯ দিন পর রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে লিটন দাস-সাইফ হাসানদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন আসিফ নজরুল। অথচ ওই সময় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি, সহসভাপতিসহ তিনজন ছিলেন সাবেক অধিনায়ক। তাঁরাও বোঝেননি ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থা! এখন সেই চিঠির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সচিব মাহবুব ‘এটি তো মীমাংসিত বিষয়’ বলে প্রথমে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। পরে যদিও বলেছেন, ‘তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আমাকে চিঠি ইস্যু করতে বলেছিলেন, তাই করেছিলাম।’
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ায় সভাপতি হিসেবে আমিনুল এবং তাঁর বোর্ডেরও দায় আছে বলে মনে করেন ওই পরিচালনা পর্ষদের আরেকজন সদস্য। ক্রিকেট কূটনীতিতে আমিনুল ব্যর্থ হয়েছেন বলেই জোর দাবি তাঁর, ‘খেলতে না পারাটা খুবই দুঃখজনক। আমাকেও খুব কাছ থেকেই এটার সাক্ষী হয়ে থাকতে হলো। কেন এমনটা হলো, তার বিস্তারিত হয়তো আমাদের মতো অনেকেই জানেন না। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলাম যেন খেলার স্থান পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় নেওয়া হয়; কিন্তু চিঠিপত্র আদান-প্রদান বা যোগাযোগে সফল হতে পারিনি। বুলবুল (আমিনুল) আর ফারুকই এগুলো দেখতেন। আমাদের ক্রিকেট কূটনীতি বা বিসিবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সব দিক থেকেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমরা অন্য কোনো দেশে খেলার সুযোগটুকুও তৈরি করতে পারিনি।’
কালের কণ্ঠ



