আন্তর্জাতিক

একের পর এক চুক্তির পরও কেন বারবার শান্তি ফিরছে না গাজায়?

গত জুলাই মাসের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস গাজার জন্য একটি ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস তাদের অস্ত্র তুলে দেবে ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের একটি কমিটির হাতে। এই প্রক্রিয়া যাচাই করবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিনিময়ে ইসরাইল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।

কিন্তু ৯ আগস্ট ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের দূত জ্যারেড কুশনার মিসরের উপকূলে গিয়ে হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এরপর তিনি জেরুজালেমে যান। সেখানে প্রস্তাব দেওয়া হয়, অস্ত্র হস্তান্তরের কাজটি এবার তদারকি করবেন একজন মার্কিন জেনারেল, কোনো আন্তর্জাতিক কমিটি নয়। নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তনই স্পষ্ট করে দেয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গাজা নিয়ে হওয়া প্রতিটি চুক্তিতেই আসলে কী ভুল ছিল। কোনো চুক্তিতেই আগে থেকে ঠিক করা হয়নি, কে যাচাই করবে যে শর্ত পালন হচ্ছে কিনা।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস এগ্রিমেন্ট ডেটাবেসে ২০২৫ সালে গাজা যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত চারটি চুক্তির তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে আছে জানুয়ারির একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি, অক্টোবরে কয়েকটি যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত চুক্তি, এবং নভেম্বরে একটি জাতিসংঘ প্রস্তাব।

এই চুক্তিগুলোতে জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের মতো বিষয় ছিল। গাজার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তিতেই এমন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যা ঠিক করে দেবে কী হলে তা চুক্তি ভঙ্গ বলে গণ্য হবে, বিরোধ হলে কে সেটার মীমাংসা করবে, আর ভঙ্গের পর প্রক্রিয়া আবার কীভাবে শুরু হবে।

একাধিক চুক্তির ইতিহাস
এই চারটি চুক্তির মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারির চুক্তিতেই সবচেয়ে বেশি বিস্তারিত শর্ত ছিল। সেখানে কতজন জিম্মি ও বন্দি বিনিময় হবে, কোন করিডোর দিয়ে ইসরাইলি সেনারা গাজা ছাড়বে, আর কোন ক্রমে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ঘরে ফিরবে, তার বিস্তারিত ছিল। কিন্তু এই শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে কিছুই বলা ছিল না।

চুক্তির জামিনদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারকে শুধু আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল-থানি চুক্তির পাশাপাশি একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কথা জানিয়েছিলেন, তবে এটি চুক্তির লিখিত অংশ ছিল না। জামিনদারদের শুধু সমস্যা নথিভুক্ত করার অধিকার দেওয়া হয়েছিল, চুক্তি বাস্তবায়ন করানোর ক্ষমতা নয়।

এই ঘাটতিটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ১ মার্চ চুক্তির প্রথম পর্ব শেষ হয় আর দ্বিতীয় পর্ব ঝুলে থাকে। এরপর ১৮ মার্চ ইসরাইল আবার বোমা হামলা শুরু করে।

অক্টোবরের দুই চুক্তি
২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া দুটি চুক্তি নতুন শর্তে প্রক্রিয়াটি আবার সচল করার চেষ্টা করে। ১০ অক্টোবরের চুক্তিতে জানুয়ারির চুক্তির বাস্তবায়ন-ঘাটতি দূর করার চেষ্টা করা হয়।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক শাখা সেন্ট্রাল কমান্ড ইসরাইল থেকে পরিচালিত একটি কেন্দ্র তৈরি করে, যা সহায়তা সমন্বয় ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের কাজ করবে। কিন্তু দুই মাস পরও তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ত্রাণকর্মী ও জাতিসংঘ কর্মীরা অভিযোগ করেন, ত্রাণ সরবরাহে বাধা এখনো আছে। গাজা কে শাসন করবে আর নিরাপত্তা দেবে, তা নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।

১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার ও তুরস্কের নেতারা তথাকথিত ‘ট্রাম্প ডিক্লারেশন ফর এনডিউরিং পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’-তে সই করেন। এই চুক্তিতে ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও অঞ্চলজুড়ে সংলাপ নিয়ে বেশ কিছু নীতিমালা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

তবে ইসরাইল বা হামাস কেউই এই চুক্তিতে সই করেনি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ যুদ্ধরত পক্ষগুলো যা সই করতে চায় না, জামিনদাররা প্রায়ই সেটাতেই সই করে। কিন্তু চারটি সরকার এমন দুই পক্ষের হয়ে সহনশীলতা ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না, যারা নিজেরাই সই করেনি। আর চুক্তির লেখাতেও বলা নেই, তাদের দিয়ে এসব মানানোর জন্য কী করা হবে।

নভেম্বরের চুক্তি
জাতিসংঘের নভেম্বরের প্রস্তাবটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনা, যার নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান টু এন্ড দ্য গাজা কনফ্লিক্ট’, অনুমোদন করা হয়। এছাড়া গাজার রাজনৈতিক পরিবর্তন তদারকির জন্য নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থার প্রধান হিসেবে বোর্ড অব পিসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু এই বোর্ডে কারা থাকবেন, নারীরা থাকবেন কিনা, এসব নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। নারীদের প্রসঙ্গ এসেছে শুধু বন্দি ও জিম্মির প্রসঙ্গে।

তবে এই প্রস্তাবে গাজার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনি জনগণের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয়তা’ নিয়েও একটি ধারা রাখা হয়। কিন্তু এই প্রস্তাবেও আগের যুদ্ধবিরতিগুলোর মতোই একই দুর্বলতা রয়ে গেছে।

জাতিসংঘের এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার ‘বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন হলে’ এবং গাজার পুনর্গঠন ‘এগিয়ে গেলে’ রাষ্ট্র গঠনের পথ খুলবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তৈরি হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, গাজা ও পশ্চিম তীরের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে। কিন্তু এই দুটি শর্ত কবে পূরণ হয়েছে বলে গণ্য হবে, তা বিচার করার জন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

১৫ দফা পরিকল্পনা
এখানেই আসে সেই ১৫ দফা পরিকল্পনার প্রসঙ্গ, যা আগের চুক্তিগুলোর ঘাটতি দূর করার একটা চেষ্টা ছিল। এই পরিকল্পনায় একটি আন্তর্জাতিক যাচাই কমিটি রাখা হয়েছিল, যা প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করবে যে দুই পক্ষই তাদের শর্ত পূরণ করেছে।

কিন্তু এই পরিকল্পনায় প্রতিশ্রুত ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের ধাপে ধাপে পরিকল্পনাটি এখন পাল্টে গেছে। ১৭ আগস্ট বোর্ড অব পিস ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করে যে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনারা গাজা থেকে সরবে না। এই নিরস্ত্রীকরণ যাচাইয়ের দায়িত্বও এখন একটি বহুপাক্ষিক কমিটি থেকে সরে গিয়ে চলে গেছে একজন মার্কিন জেনারেলের হাতে।

এই চুক্তির যেকোনো কার্যকর সংস্করণে দরকার এমন একজন বিচারক, যাকে দুই পক্ষই মেনে নেবে। এটা ঠিক করতে হবে প্রক্রিয়া শুরুর আগেই, আর চুক্তি ভঙ্গ হলে কী হবে, তারও স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে। যেসব আঞ্চলিক জামিনদার দেশ এসব চুক্তি সম্ভব করেছে, তাদেরও এই ব্যবস্থার ভেতরে রাখতে হবে।

এর বাইরেও দরকার এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যেখানে গাজার ফিলিস্তিনিদেরও কিছু মতামত থাকবে। তাদের সামনে থাকতে হবে একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আর যুদ্ধের আঘাত সামলানোর কিছু উপায়। এসব না থাকলে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বিরোধ মিটে গেলেও একই ঘাটতি আবার একই অচলাবস্থা তৈরি করবে।

সূত্র- সিয়াসাত.কম

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension