
প্রধান খবরবাংলাদেশরাজনীতি
এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা, দমন-পীড়ন ও হত্যার রাজনীতি
জাকির হোসেন
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতনের পর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছেন সামরিক স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এবার বিরোধী দলের আসনে বসছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা।
বিগত দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলে থাকলেও ক্ষমতার স্বাদ নিতে ভুল করে নি। দলের কয়েকজন যোগ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায়। আর খোদ এইচ এম এরশাদ বিগত ৫ বছর ছিলেন মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ফলে ৩০ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে জাতীয় পার্টি এবং এরশাদের উত্থান, পতন, ক্ষমতা দখল, দমন, পীড়ন ও হত্যার রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের পতন হয়। ‘৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১০টায় এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।

এরশাদ তার ৯ বছরের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রতিহত করতে কত মানুষ যে হত্যা করেছেন এর কোনও সঠিক হিসেব নেই। তার শাসনামল জুড়েই ছিল গণতন্ত্রকামী মানুষের মৃত্যুর মিছিল। আন্দোলন-সংগ্রাম ঠেকাতে গ্রেফতার করা হয় বহু রাজনৈতিক নেতাসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে। অন্তরীণ করা হয় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের কারারুদ্ধ করেন এরশাদ। বর্তমানে মহাজোট সরকারের মূল দল আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন কেউই রেহাই পান নি।
তাই দুর্নীতিপরায়ণ স্বৈরাচারী এরশাদের পতনে দেশের সর্বস্তরের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বিজয় উৎসব। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শোকরানা দিবস পালন করে। আর বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা গির্জা ও কমলাপুর বৌদ্ধবিহারে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা ।
পতনের সিঁড়ি
সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী প্রথম বড় ধরনের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যা মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। আর এদিন থেকেই শুরু হয় সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ আমলের রক্তঝরার ইতিহাস। এদিন মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কাঞ্চন, জাফর, জয়নাল, আইয়ুব, দিপালী ও ফারুক। ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংগ্রাম আহূত সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রদের একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল সকাল ১১টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। ফলে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন জয়নাল, জাফর এবং দিপালী সাহাসহ কয়েকজন।
নিহতদের কয়েকজনের লাশ গুম করে সরকার। কিন্তু সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা এতটাই ব্যাপক ছিল যে এই বিক্ষোভ এবং ছাত্রহত্যার ঘটনার বিষয়ে পরদিন কোনও পত্রিকায় সরকারের প্রেসনোটের বাইরে অন্য কোনো খবর প্রকাশ হতে পারে নি।
অবিরাম রাজনৈতিক হত্যা

১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল চলাকালে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন ও ইব্রাহিম সেলিম। ১ মার্চ সেলিম ও ইব্রাহিম হত্যার প্রতিবাদে ৭ দল ও ১৫ দল হরতাল ডাকে। সেই হরতালে নিহত হন শ্রমিক তাজুল ইসলাম।
২৭ সেপ্টেম্বরের হরতালে ঢাকার কালীগঞ্জে নিহত হন রাজনৈতিক নেতা ময়েজ উদ্দিন। এদিন স্বপন কুমার, নেত্রকোনায় তিতাস ও অপর একজন নিহত হন। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে একজন রিকশাওয়ালা ও ফুটপাতের একজন দোকানদার এবং ঢাকার বাইরে আরও দুজন নিহত হন। ২৪ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিহত হন। ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় হলের বাবুর্চি আশরাফ, ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আবদুল আজিজ।
১৯৮৫
১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া। ১৯ মার্চ হরতাল চলাকালে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। ২২ এপ্রিল মিছিলে বোমা হামলায় একজন, ৯ অক্টোবর তেজগাঁও পলিটেকনিকে ৪ জন, ৩০ অক্টোবর ছাত্রনেতা তিতাস, ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে বিডিআরের গুলিতে ছাত্র স্বপন ও রমিজ নিহত হন। ৭ নভেম্বর আদমজী জুট মিলে ধর্মঘটে হামলায় ১৭ শ্রমিক এবং বিডিআরের গুলিতে তিন শ্রমিক নিহত হন।

১৯৮৬
৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয় ৫ জন, ১৪ মে হরতালে নিহত হন ৮ জন, ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনে নিহত হন ১১ জন, ১০ নভেম্বর হরতাল চলাকালে ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় নিহত হয় সাহাদত নামে এক কিশোর ।
১৯৮৭
২২ জুলাই জেলা পরিষদ বিল প্রতিরোধ ও স্কপের হরতালে নিহত হন ৩ জন, ২৪ অক্টোবর শ্রমিক নেতা শামসুল আলম, ২৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের লক্ষ্মীপুরে কৃষক জয়নাল, ১ নভেম্বর কৃষক নেতা হাফিজুর রহমান মোল্লা, ১০ নভেম্বর নিহত হন যুবলীগ নেতা নূর হোসেন এবং ১১ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আবুল ফাত্তাহ, ছাত্র বাবলু, যুবনেতা টিটো, শেরপুরের আমিন বাজারে পুলিশের গুলিতে উমেছা খাতুন, গোলাম মোহাম্মদ আসলাম, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোকন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও তিনজন নিহত হন। এরপর ৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রনেতা দৌলত খান নিহত হন।
১৯৮৮
২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভায় আগত মিছিলে গুলিবর্ষণে নিহত হন ২২ জন। এরা হলেন ক্ষেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, হোটেল কর্মচারী জিকে চৌধুরী, ছাত্র মহিউদ্দিন শামীম, বদরুল, শেখ মোহাম্মদ, সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন, আলবার্ট গোমেজ, আবদুল মান্নান, কাশেম, ডিকে দাস, কুদ্দুস, পংকজ বৈদ্য, চান মিঞা, হাসান, সমর দত্ত, পলাশ, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন ও সাহাদাত হোসেন। এ বছর ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হামলায় নিহত হন ১৫ জন।
১৯৯০১০ অক্টোবর সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ছাত্রনেতা জেহাদ ও মনোয়ার, হকার জাকির এবং ভিক্ষুক দুলাল। ১৩ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে নিহত হয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও সাধন চন্দ্র শীল। ২৭ অক্টোবর হরতাল চলাকালে ঢাকার বাইরে দুজন, ১৪ নভেম্বর আদমজীতে ১১ জন নিহত হয়। ২৬ নভেম্বর নিহত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের দোকানদার নিমাই। ২৭ নভেম্বর এরশাদের লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলন।
২৮ নভেম্বর সারাদেশে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৫০ জন বিক্ষোভকারী। ২৯ নভেম্বর শাহজাহানপুরে ১ জন ও খিলগাঁওয়ে ২ জন নিহত হন।
৩০ নভেম্বর বিডিআরের গুলিতে রামপুরা ওয়াপদা রোডে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় নিহত হন মা।
১ ডিসেম্বর মিরপুরের ১০ নম্বর এলাকায় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর গুলিতে ছাত্র জাফর, ইটভাঙা শ্রমিক আবদুল খালেক, মহিলা গার্মেন্টকর্মী ও নুরুল হুদাসহ ৭ জন এবং এক নম্বর এলাকায় আরও ৯ জন নিহত হন।

এছাড়া জরুরি অবস্থা অমান্য করায় এদিন ডেমরায় ৩ জন, ইউসুফ মার্কেটে ১ জন, নীলক্ষেতে একজন, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একজন, খুলনার খালিশপুরে মহাব্রজ, নারায়ণগঞ্জের মণ্ডলপাড়ায় এক কিশোর নিহত হয়, ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে দুজন, ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহে দুজন, রাজশাহীতে দুজন, ধানমন্ডিতে একজন ও জিগাতলায় একজন নিহত হন।



