যুক্তরাষ্ট্র

চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলে ‘আগ্রাসী’ যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা এক পোস্টে এই সিদ্ধান্ত জানান তিনি। একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা ‘সংবেদনশীল’ বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম কঠোর সেন্সরশিপ ব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের শাসনে পার্টির মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের প্রতি নজরদারি আরও জোরালো হয়েছে।

রুবিওর বিবৃতিতে ‘সংবেদনশীল’ ক্ষেত্রগুলো কী তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন ধরেই একটি উদ্বেগ রয়েছে—চীনা শিক্ষার্থীরা যেন মার্কিন প্রযুক্তি, বিশেষ করে সামরিক ব্যবহারে উপযোগী প্রযুক্তির গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে না পারে। এই আশঙ্কা থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে এমন একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, যার ফলে চীনের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে, সেখানকার স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিভাগের স্নাতকদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন ‘চায়না ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচিও চালু করেছিল। যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে চীনের গোয়েন্দা তৎপরতা রোধ করা। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উদীয়মান প্রযুক্তি চুরি ঠেকানো। তবে এই কর্মসূচি অনেকে কাছে ১৯৫০-এর দশকের ‘কমিউনিস্ট আতঙ্ক’ বা ‘রেড স্কেয়ার বা লাল আতঙ্ক’ ধারণার পুনরাবৃত্তি বলে নিন্দা করে। পরে বাইডেন প্রশাসন বাতিল করে সেটি। কারণ, এটি অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছিল এবং চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের প্রতি সন্দেহ ও বৈষম্যকে উসকে দিচ্ছিল।

এখনো পরিষ্কার নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ‘চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত’ শিক্ষার্থীদের সংজ্ঞায়িত করবে—কারণ চীনের প্রায় সর্বত্রই পার্টির প্রভাব বিস্তৃত এবং এর সদস্য সংখ্যা ৯ কোটি ৯০ লাখের বেশি। ফলে অনেক শিক্ষার্থীরই বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন পার্টির সদস্য বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকতেই পারেন।

রুবিওর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আরও এক ধাপ এগোল যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী অবস্থান এবং একই সঙ্গে ধাক্কা খেল যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা খাত, যেখানে চীনা শিক্ষার্থীরাই অন্যতম বড় ভরসা। পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতির শিরোনাম ছিল, ‘নতুন ভিসানীতি আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দেয়, চীনকে নয়।’ এতে বলা হয়, এই ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়ায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট কাজ করবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে।

মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে চীন ও হংকং থেকে আসা সব ভিসা আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে, আর ভিসার মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বড় অংশই চীনা। ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ছিল চীনা নাগরিক। সংখ্যার দিক থেকে এই তালিকায় চীনের পরেই রয়েছে ভারত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইতিমধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে—ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখা থেকে শুরু করে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া পর্যন্ত (যদিও পরে আদালত সেই আদেশ স্থগিত করে)। সেই ধারাবাহিকতায় এবার টার্গেটে চীনা শিক্ষার্থীরা।

চীনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, এমনকি চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও এই খবর নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, হঠাৎ এমন ঘোষণা চীনকে কিছুটা হকচকিত করে দিয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension