তদন্ত ‘থামাতে নয়’ বরং সহযোগিতা চাইতেই দুদকে চিঠি, দাবি তৈয়্যবের
টেলিযোগাযোগ খাতের একটি প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত ‘থামিয়ে দিতে’ চিঠি দেওয়ার বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তার ভাষ্য, ’’মূলত সেই ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়ে দুদকের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।‘’
সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ নিয়ে ব্যাখা দিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে এ দাবি করেন তিনি।
‘দুদককে থামিয়ে দিতে বিশেষ সহকারীর চিঠি, দেড়শ কোটির প্রকল্পে ব্যয় ৩২৬ কোটি’’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন রোববার প্রকাশ করে দৈনিক কালবেলা।
এ প্রতিবেদনে বলা হয়, “চাহিদা মাত্র ২৬ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথের, অথচ কেনা হচ্ছে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি, তাও প্রায় ৩২৬ কোটি টাকায়। যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে সর্বোচ্চ ১৬৫ কোটি টাকা যথেষ্ট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সুপারিশ, এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্পষ্ট আপত্তিও উপেক্ষা করে অপ্রয়োজনীয় এই যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
”তথ্য বলছে, এই প্রক্রিয়া সচল রাখতে দুদকের কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। যিনি নিজ প্যাডে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন।’’
এদিন এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তৈয়্যব। লিখিত বক্তব্যে তিনি টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সকে কেন্দ্র করে ’স্বার্থান্বেষী মাফিয়াদের রোষানলে পড়েছেন’ বলে অভিযোগ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তার অবস্থান তুলে ধরে দুদককে চিঠি দেওয়ার কারণও তুলে ধরেন।
’বিটিসিএল’র ফাইভজি রেডিনেস’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নিয়ে অভিযোগের পর অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওই অভিযোগে বলা হয়, দরপত্রের শর্তানুযায়ী দরদাতাদের মূল্যায়ন না করে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে শুধু প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যের ভিত্তিতে তিনজন দরদাতাকেই কারিগরিভাবে ‘রেসপনসিভ’ ঘোষণা করাসহ ‘নন রেসপনসিভ’ দরদাতাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫ গুণ বেশি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কিনে বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি করা হচ্ছে।
এ অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ’পিপিএ ও পিপিআর লঙ্খনের প্রমাণ মেলার’ তথ্য দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে গত ১৮ জুন চিঠি দেয়। এতে প্রকল্পের ‘অর্থছাড় বন্ধ রাখার’ পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতেই প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তৈয়্যব গত ২২ জুন দুদক চেয়ারম্যানকে চিঠি লেখেন।
এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসে এর ব্যাখ্যা দেন। বলেন,” বিটিসিএল যেই ফাইবার নেটওয়ার্ক বর্ধিতকরণের যে প্রকল্প বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছিল, যার দরপত্র বিগত সময়ে হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার কাজগুলো বিগত সরকারের আমলে হয়েছে এবং সেখানে যে একটা ঋণপত্র করা হয়েছিল, আমি এবং নাহিদ ইসলাম (সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা) দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেই ঋণপত্রে ২৯০ কোটি টাকা অফেরতযোগ্য এলসিও পরিশোধ করা হয়ে গেছে–এই সবকিছু আমলে নিয়ে আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনের মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে কথা বলি।
”আমি নিজে উনার অফিসে গিয়েছি। আমি বলেছি যে স্যার যেহেতু ২৯০ কোটি টাকা চলে গেছে এবং যেহেতু এটা সর্বনিম্ন দরদাতা এবং দরদাতা নিয়ে যে অপতথ্যটা এসেছিল, সেটা বুয়েট যেহেতু ক্ল্যারিফাই করেছে, আমরা একটা কমিটি করে দেব।”
তিনি বলেন, ”এই কমিটির মাধ্যমে যে যন্ত্রপাতিগুলো তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে (এটা ওএসআর ৯৮০০ এ২ এবং এম২) বিটিসিএলের যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড খাতে ইতিমধ্যেই এটা স্থাপিত হচ্ছে এবং ব্যাপক আকারে স্থাপিত হচ্ছে। কিছু বিশেষ কোম্পানি বিটিসিএলকে এই মার্কেট থেকে আউট করে দিতে চায়। তো আমরা এই বক্তব্য যখন তুলে ধরেছি, তখন বলা হয়েছে, ঠিক আছে, আমাদেরকে বিস্তারিত জানানো হোক।
“সেই রেফারেন্সে আমি মাননীয় দুদক চেয়ারম্যানকে একটা চিঠি লিখি। এই চিঠিতে আমি মূলত আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরি যে যেহেতু টাকাটা চলে গেছে, যেহেতু আমাদের বিটিসিএলের ক্যাপাসিটি সম্প্রসারণ দরকার–আপনারা জানেন যে বর্তমানে যে ক্যাপাসিটি আছে, এটা জেলা পর্যায়ে মাত্র এক জিবিপিএস, এটা দিয়ে আসলে বেটার কোয়ালিটি ইন্টারনেট সেবা দান অসম্ভব। এখন এই মুহূর্তে বিটিসিএল যদি এই নেটওয়ার্ক আপগ্রেড না করে, তাহলে খুব দ্রুতই সে মার্কেট আউট হয়ে যেতে পারে।”
দাবির স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন যেহেতু তার প্রতিদ্বন্দ্বীগুলো নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করছে এবং বিটিসিএল বিভিন্ন ঝামেলার কারণে–যেগুলো সাবেক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিভিন্ন কারণে, এই কাজটা বন্ধ হয়ে আছে, সেজন্য বিটিসিএলের যে ফাইবার নেটওয়ার্ক আছে, এটা এক্সপ্যান্ড করা যাচ্ছে না।”
তার দাবি, এটাকে অপব্যাখ্যা করে তাকে ব্যক্তিগতভাবে, মন্ত্রণালয়কে এবং সরকাররের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে।
“আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি এবং আমার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো ধরনের কোনো দুর্নীতিতে জড়িত নই এবং এখানে যত ধরনের কাজ হয়েছে, প্রত্যেকটা কাজ আগের সরকারের আমলে হয়েছে। আমরা শুধুমাত্র কিছু চিঠি আদান-প্রদান করে আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি এবং মতামত ব্যক্ত করে চিঠির শেষ লাইনে মাননীয় দুদক চেয়ারম্যানের আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছি। এর বাইরে আমরা কোনো নির্দেশ দেইনি।“
নতুন নীতিমালায় ’দেশীয়রা ব্যবসা হারাবেন’ – এটা ’সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা’
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ সহকারী তৈয়ব ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে আইসিএক্স, আইজিডব্লিউ ও আইআইজি লাইসেন্সধারী ‘দলীয় অপারেটরদের’ অনেকে সরকারের দুই হাজার কোটি টাকার বেশি অনাদায়ী রেখে কোম্পানি বন্ধ করে চলে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ২০১৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে সাতটি আইজিডব্লিউ অপারেটর ফোরাম ‘আইওএফ’ নামে একটি জোট গঠনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তৎকালীন সময়ে বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ আইওএফকে বৈধতা দিতে এটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু রাখে, যা প্রায় ১২ বছর পরীক্ষামূলকই ছিল।“
এর কারণে গত ১২ বছরে সরকারের আট হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ক্ষতির কারণ হওয়ার দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, “এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির পুরোটাই সালমান রহমান গংদের পকেটে ঢুকেছে।’’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আগের সরকারের আমলে মোবাইল অপারেটরদের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন নিষিদ্ধ করা এবং এ সেবার লাইসেন্স ‘একচেটিয়া ও পক্ষপাতমূলকভাবে’ দুইটি কোম্পানিকে দিয়ে ‘একচেটিয়া’ বাজার ব্যবস্থা সৃষ্টির কথা বলেন।
তার দাবি, নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা অনুমোদন হলে একচেটিয়া বাজার বন্ধ হয়ে যাবে।
“দেশীয় ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার নামে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পাওয়া লাইসেন্সধারীদের, বিশেষত ঋণ খেলাপিদের ব্যবসা রাখার দায় নেব না। তাদের বকেয়া না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারি না। তবে কারও লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হবে না। লাইফটাইম শেষে নতুন লাইসেন্স রেজিমে ব্যবসা করতে হলে নতুন বিনিয়োগ করে, নতুন লাইসেন্স করতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার দাযিত্ব গ্রহণের পর বিটিআরসি পুনর্গঠিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর জন্য এনটিটিএন, আইএসপি, আইসিএক্স, আইজিডব্লিউ ও আইআইজি অপারেটরসহ সব অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছে।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত সংস্কারে একটি সরলীকৃত তিন-স্তরের লাইসেন্সিং ফ্রেমওয়ার্ক চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।’’
তৈয়ব্যের অভিযোগ, “বর্তমানের অনেকেই প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরোধিতা করে পূর্বতন আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যবসায়িক সুবিধাভোগীদের সাথে অজান্তেই একমত পোষণ করছে ।
”বর্তমান অবস্থান থেকে মনে হয়, তারা ভুল তথ্য বা প্ররোচনার শিকার হয়েছেন।’’
দেশি উদ্যোক্তারা, আইসিএক্স ও আইজিডব্লিউ অপারেটররা দাবি করছে নতুন নীতিমালার কারণে দেশীয়রা ব্যবসা হারাবে, দেশেও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা সম্পূর্ণ একটা অপব্যাখ্যা। আমরা বলেছি, নতুনরা যখন তাদের লাইসেন্স রেজিম শেষ করবে, তখন কারও লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হবে না। প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট সময়, ১০ বা ১৫ বছরের মেয়াদে, লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের লাইসেন্সের মেয়াদকালে প্রভাবমুক্ত ভাবে কাজ করতে পারবে, তাদের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হবে না।“
এসব লাইসেন্স ‘আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত’ না হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “নতুন লাইসেন্স দেওয়ার জন্য আমরা এই লাইসেন্সগুলো কন্টিনিউ করব না। তখন তাদেরকে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন লাইসেন্স কিনে, নতুনভাবে ব্যবসা করতে হবে। এবং আমরা সেজন্য বলেছি, যারা নতুনভাবে আবেদন করবে, আমরা তাদেরকে অগ্রাধিকার দেব। এটা স্পষ্টভাবে নতুন পলিসিতে বলা আছে।”



