অর্থনীতি ও বাণিজ্যপ্রধান খবরবাংলাদেশ

বন্যার অজুহাতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা ভোক্তা

আমাদের দেশে নানা অজুহাতে বাড়ে পণ্যমূল্য। এবার পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য অজুহাত হিসাবে দাঁড় করানো হয়েছে বন্যা। যদিও বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। দেশের কয়েকটি এলাকায় স্বল্প মেয়াদে বন্যা হয়েছে এটা সত্য। তবে সেটা গোটা দেশের পণ্যমূল্যকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার যে অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে সেটা অযৌক্তিক। বন্যার অজুহাতে শুক্রবার পাইকারি ও খুচরা বাজারে মাছ, সবজি, ব্রয়লার মুরগি, ডিমসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম একযোগে বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি এমন-রাজধানীর খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি মাছ ৩০-১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামও আকাশছোঁয়া। ডজনপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ডিমের মূল্য ঠেকানো হয়েছে ১৪০ টাকায়। সঙ্গে ব্রয়লার মুরগি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদারকির অভাবে সরবরাহ সংকটের সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও সুযোগ বুঝে ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। এতে শুক্রবার ছুটির দিন বাজারে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা ভোক্তা।

শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজারসহ একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিকেজি চাষের রুই ও কাতল বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৫০ টাকা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসা হিসাবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের দামও কেজিতে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০-২৬০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ২২০-২৩০ টাকা ছিল। সঙ্গে প্রতিকেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়, যা আগে ২২০ টাকা ছিল। পাশাপাশি কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে চাষের চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৯০০-১২০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ৮০০-১১০০ টাকা ছিল। খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি পাবদা ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা।

নয়াবাজারে মাছ কিনতে আসা মো. আসলাম বলেন, বাজারে বন্যার অজুহাতে মাছের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাজারে সব ধরনের মাছের সরবরাহ পর্যাপ্ত। বিক্রেতারা অজুহাত দেখিয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছে। দেখার যেন কেউ নেই। ভাবা যায়, এক কেজি পাঙাশের দাম ২৫০ টাকা হয়ে গেছে।

বাজারে ডিম ও মাংসের দামেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এদিন বাজারভেদে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৮০-২১০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ১৭০-১৮০ টাকা ছিল। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৬০-৩৮০ টাকা। এছাড়া সংকটের অজুহাতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়, যা আগে ১২৫-১৩০ টাকা ছিল। এছাড়া প্রতিকেজি গরুর মাংস ৭৫০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংস কিনতে ক্রেতার ১২০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে সব ধরনের সবজির দামও প্রতিকেজি ২০-৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি ঝিঙা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, যা আগে ৬০ টাকা ছিল। চিচিংগার দাম কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকা, যা আগে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সঙ্গে প্রতিকেজি ধুন্দল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, যা গত সপ্তাহেও ৬০ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা, যা আগে ৬০-৭০ টাকা ছিল। কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া বরবটির দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। এছাড়া ১২০ টাকা কেজির কাঁচামরিচের দাম উঠেছে ২০০ টাকা।

কাওরান বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা নাজমুল বলেন, কী দিয়ে ভাত খাব। দামের কারণে মাছ-মাংসে হাত দেওয়াই যায় না। ডিম কিনে বাড়ি ফিরব তারও উপায় নেই। ডজনে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া সবজির দামে ফের আগুন। সব ধরনের সবজির দাম বাড়িয়েছে বিক্রেতারা। বন্যায় কৃষকের মাঠের ফসল নষ্ট হয়েছে সেটা সত্য, তবে যেখানে বন্যা হয়েছে নষ্ট সেখানেই হয়েছে। অন্যান্য অঞ্চল থেকে সবজি আসছে। বাজারেও সরবরাহ আছে। কিন্তু বিক্রেতারা বন্যার অজুহাতে একযোগে সব ধরনের সবজি বাড়তি দরে বিক্রি করছে। তিনি জানান, বাজারে এসে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। যে টাকা বাজেট করে এনেছি সে টাকায় সব পণ্য কিনতে পারব না।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, বাজারে বিক্রেতারা সব সময় সুযোগ খোঁজে। এবার বন্যার অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে অসাধু চক্র। বন্যায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো সংকট নেই। কিন্তু অজুহাত কাজে লাগিয়ে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা অযৌক্তিক। তদারকির মাধ্যমে বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অনিয়ম থাকলে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা যেন দৃষ্টান্তমূলক হয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, বাজারে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদারকি চলমান আছে। অন্য আরও সংস্থা বাজারে তদারকি করছে। পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সব পর্যায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। অনিয়ম পেলেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মূল্য সহনীয় রাখতে এই কার্যক্রম চলমান থাকবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension