
বাংলাদেশের যুদ্ধ: যে লেখাটি ইতিহাস বদলে দিয়েছিল
মূল রচনা: মার্ক ডামেট
অনুবাদ: জাহান আরা দোলন
১৯৭১ সালের ১৩ জুন যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে পাকিস্তানের নির্মম দমন নিপীড়নের কথা প্রকাশিত হয়। ইতিহাস বদলে দেওয়া এই নিবন্ধ রচয়িতা সাংবাদিককে তার পরিবারসহ আত্মগোপন করতে বাধ্য করেছিল।
‘আব্দুল বারীর ভাগ্যটা খারাপ। পূর্ব বাংলার হাজার হাজার মানুষের মতোই সেও একই ভুল করেছে, প্রাণঘাতী ভুল। পাকিস্তানি টহলবাহিনীর সামনে পড়ে গেছে। তার বয়স মোটে চব্বিশ। সৈন্যরা হালকা পাতলা ছেলেটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। ছেলেটা ভয়ে কাঁপতে থাকল। এই বুঝি একটা গুলি এসে তাঁর বুকে বিঁধল।’
এভাবেই শুরু হয়েছিল গেল অর্ধ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার অন্যতম প্রভাবশালী নিবন্ধের।

পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের লেখাটি ছাপা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায়। এই লেখার মাধ্যমে সর্বপ্রথম দেশের পূর্ব প্রদেশে পাকিস্তান বাহিনীর অবর্ণনীয় নির্মমতার পরিমাপ প্রকাশ পায়।
কেউ জানে না ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের ধারণা, ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সংখ্যাটা ত্রিশ লক্ষ ধরেছে।
ম্যাসকারেনহাসের প্রতিবেদন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর মতামতকে ঘুরিয়ে দিতে এবং ভারতকে চুড়ান্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সাহস যুগিয়েছিল।
সানডে টাইমসের তৎকালীন সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্স স্মরণ করলেন, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে বলেছিলেন যে, নিবন্ধটি তাকে এত প্রচন্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছিল যে এটি তাকে ‘ইউরোপিয় রাজধানী এবং মস্কোতে ব্যক্তিগতভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ’ গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল, যেন ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের ভিত তৈরি করা যায়।
এটা কখনওই মাসকারেনহাসের উদ্দেশ্য ছিল না। ইভান্স তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন, ন্যায়ের পক্ষে কাজ করা খুব ভালো একজন সাংবাদিক।
তিনি খুবই সাহসী ছিলেন। পাকিস্তানে তখন সামরিক শাসন চলছিল, এবং তিনি জানতেন যে, প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার আগেই তার নিজেকে এবং পুরো পরিবারকে দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। তখনকার সময়ে এটা কোনও সহজ বিষয় ছিল না।
‘তার মা তাকে সবসময় সত্যের জন্য লড়াই করতে বলতেন’। ইভন, ম্যাসকারেনহাস’র বিধবা স্ত্রী স্মৃতিচারণ করছিলেন (১৯৮৬ সালে ম্যাসকারেনহাস মারা যান)। ‘তিনি সবসময় বলতেন, আমার সামনে একটা পাহাড় খাড়া করে দিলে, আমি পাহাড় বেয়ে উঠব। তাকে কোনও কিছুই দমিয়ে রাখতে পারত না।’
১৯৭১ সালের মার্চে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়, অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তখন করাচির একজন নামী সাংবাদিক। দেশের পশ্চিম অংশের প্রধান শহর করাচি। করাচির শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ম্যাসকারেনহাসের বেশ ভালো সম্পর্ক। স্থানীয় গোয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। তার এবং ইভনের পাঁচ ছেলেমেয়ে।
পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের নির্বাচনে জয়লাভ থেকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন চাইছিল।
সামরিক বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সরকার গঠন বিষয়ে তর্ক বিতর্কে বাঙালিরা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে সরকার গঠনে বাধা দিচ্ছে।
পরিস্থিতি হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে। সরকারবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় তীব্র এক গণঅভ্যুত্থানে। সরকারের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষে হাজার হাজার সৈন্য ঢাকায় উড়ে আসে সামরিক সরকারের শক্তিবৃদ্ধি করতে।
পাকিস্তানি বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু সম্প্রদায় আর সাধারণ বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে পূর্ব পরিকল্পিত অভিযান শুরু করে।
সৈন্যরা অন্যান্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায়, ছাত্র শিক্ষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে। আক্রমণের পরিধি শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। স্থানীয়রা তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই পরিকল্পনা আপাতদৃষ্টিতে সফল হয়েছে বলে মনে করে পাকিস্তানিরা। তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সাংবাদিক নিয়ে এসে বিশ্বের দরবারে এই মুক্তিযোদ্ধাদের দমনের সফলতা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকদের আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। পাকিস্তানিরা, প্রতিপক্ষের মাধ্যমে সংঘটিত নৃশংসতার খবর ছাপতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকরা দশহাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়ে ছিল, যেটা একটা যুদ্ধাপরাধ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যেটা অনেকেই স্বীকার করে না।
আটজন সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তানে দশ দিনের সফর করেন, যাদের একজন অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস। সাংবাদিকরা পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী রিপোর্ট করেন। একজন ছাড়া। তিনি, করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক এবং ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস।
ইভন ম্যাসকারেনহাস লন্ডনের বাসায় বসে স্মৃতিচারণে বলছিলেন, ‘আমি আমার স্বামীর এ রকম চেহারা আগে কখনও দেখি নি। তিনি উদ্বিগ্ন অবস্থায় ঘরে ফিরেছিলেন। তাকে ক্ষুব্ধ, চিন্তিত, বিষণ্ণ আর আবেগী দেখাচ্ছিল।’
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যা দেখেছি, সেটা যদি লিখতে না পারি, আমি হয়ত আর কখনওই কোন কিছু লিখতে পারব না।’
তবে পাকিস্তানে বসে সেটা লেখা সম্ভব নয়। কারণ গণমাধ্যমের সব প্রতিবেদনই সেন্সর করা হতো। এবং তিনি যদি সেই চেষ্টাও করেন, তাকে গুলি করে মেরে ফেলবে।
অসুস্থ বোনকে দেখার নাম করে ম্যাসকারেনহাস তখন লন্ডনে চলে যান। এরপর সরাসরি লন্ডন টাইমসের সম্পাদকের দপ্তরে গিয়ে দেখা করেন।
ইভান্স লিখেছেন, ‘সে মার্চ মাসে বাঙালিদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় হতচকিত হয়ে গেছিল কিন্তু সে এটাও বলেছে, সেনাবাহিনী যেটা করছে সেটা পুরোপুরি নারকীয়।’
তিনি তাকে বলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং আর্মি অফিসারদের বলতে শুনেছি যে এটাই চুড়ান্ত সমাধান।’
হ্যারল্ড ইভান্স প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু আগে ইভন আর বাচ্চাদের করাচি থেকে বের করে আনতে হবে।
তারা সিদ্ধান্ত নেন সবকিছু ঠিকঠাক করে পালানোর আগে সংকেতমূলক একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হবে, যেখানে লেখা থাকবে, ‘অ্যানের অপারেশন সফল হয়েছে।’
ইভন ম্যাসকারেনহাস বলছেন, ‘পরদিন ভোর তিনটায় আমি টেলিগ্রামটি পাই। তখন আমার মনে হয়েছিল, ‘হা ঈশ্বর, আমাদের এখন লন্ডন যেতে হবে।’ আমাকে সবকিছু ফেলে রেখে চলে যেতে হবে। এটা ছিল ভয়াবহ এক বিষন্ন অনুভূতি। আমরা প্রত্যেকে মাত্র একটা করে সুটকেস নিতে পেরেছিলাম। মৃতদেহকে শেষ বিদায় জানানোর মতো করে কাঁদছিলাম।’
সন্দেহ এড়াতে পরিবার রওনা হবার আগে ম্যাসকারেনহাস পাকিস্তানে ফিরে আসেন। কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, পাকিস্তানীরা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেত। তাই পরিবার চলে যাওয়ার পর তিনি সড়ক পথে গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে আফগানিস্তানে ঢুকে পড়েন।
লন্ডনে পুরো পরিবার একত্রিত হওয়ার পরের দিনই, সানডে টাইমস পত্রিকায় ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
বিশ্বাসঘাতকতা
প্রতিবেদনটি খুবই শক্তিশালী ছিল, কারণ পাকিস্তানি সামরিক অফিসাররা ম্যাসকারেনহাসকে বিশ্বাস করতেন এবং তিনি তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন।
সেনাবাহিনীর হত্যা আর পোড়ানোর অভিযান আমি নিজে দেখেছি। বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দেয়ার পর শহর আর গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দেখেছি।
আমি সমস্ত গ্রামের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালাতে দেখেছি।
রাতের বেলা অফিসার্স মেসে কর্মকর্তাদের সাহসিকতার সাথে হত্যাযজ্ঞ চালানোর বর্ণনা করতে শুনেছি।
‘আজ কয়টাকে মারলে?’ সেই উত্তরগুলো এখনও স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
এই প্রতিবেদনটিকে পাকিস্তান প্রতারণা হিসাবে মূল্যায়ন করেছে এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে শত্রু এজেন্ট হিসাবে গণ্য করেছে। তার প্রতিবেদনের সমস্ত তথ্যকে তারা অস্বীকার করে একে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা বলে আখ্যায়িত করে ।
তবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস এরপরেও সবসময় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। ১৯৭৯ সালে তিনিই প্রথম পাকিস্তানের পারমানবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশে তাকে এখনও স্মরণ করা হয় এবং তার এই নিবন্ধটি দেশটির মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক জানিয়েছেন, ‘এটা ছিল যুদ্ধ নিয়ে লেখা একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা নিবন্ধ। আমাদের দেশের মানুষদের জবাই করে ফেলার মুহূর্তে এই প্রতিবেদন বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল এখানে আসলে কি ঘটছে।’
ইতোমধ্যে, তার পরিবার একটি তুলনামূলক ঠান্ডা, নতুন দেশে বসতি স্থাপন করেছে।
‘লন্ডনের মানুষ ভীষণরকম গম্ভীর ছিল এবং কেউ কখনও আমাদের সাথে কথা বলত না’, ইভন ম্যাসকারেনহাস স্মৃতিচারণ করছিলেন। ‘আমরা করাচিতে হাসি খুশি জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলাম। আমাদের জীবন যাপনে পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু এর জন্য আমাদের কোনও আক্ষেপ নেই।❐



