সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে

মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া আমাদের নারী শ্রমিকরা কীভাবে প্রতারণা এবং শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তা এখন আর সংশ্নিষ্টদের অজানা নয়। নারী শ্রমিকের বেশিরভাগই যে কাজের জন্যে প্রবাসে পাড়ি জমান, অধিকাংশ সেই কাজে নিযুক্ত হতে পারেন না। বরং অমর্যাদাকর অনেক কাজে জোর করে নিয়োজিত করা হয়। আবার যে পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা, তাও মেলে না। সবচেয়ে উদ্বেগ ও বেদনাদায়ক তাদের ওপর নির্বিচার যৌন নির্যাতন।

সৌদি আরবে মূলত গৃহকর্মী হিসেবে বর্তমানে দু লক্ষ তিন হাজারের বেশি নারী শ্রমিক কর্মরত। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে এদের মধ্যে ৩% অর্থাৎ ৬,০০০ শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। রোববার রাতে বাংলাদেশে ফিরে আসা ৮১ নারী তার সর্বশেষ নজির। স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পরিবার-পরিজন ফেলে অন্য দেশে গিয়ে তারা কতটা দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, ফেরত তিন নারীর মানসিক ভারসাম্য হারানোই তার প্রমাণ। প্রশ্ন হচ্ছে, এর দায় কে বা কারা নেবে? কারা ফিরিয়ে দেবে তাদের হৃত ও সম্ভ্ম?

আমরা জানি, কেবল গেল বছরই এক লক্ষ বাংলাদেশি নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছেন। তার মধ্যে ৭৩ হাজারই গেছেন সৌদি আরবে। বস্তুত ২০১৫ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের দরজা খুলে গিয়েছিল, আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হতে সময় লাগে নি। গেল বছরই প্রায় সাড়ে ১২শ’ নারী ফিরে এসেছে। গেল তিন বছরে ফিরেছেন অন্তত চার হাজার। অস্বীকার করা যাবে না যে, ফেরত আসা নারীদের কাছে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা শোনা যায়, তাতে করে তাদের ফিরে আসতে পারাই স্বস্তির।

কিন্তু কেবল এদের ফেরার মধ্য দিয়েই এই মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও বঞ্চনার নিষ্পত্তি হতে পারে না। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে যখন নারীর দৃপ্ত পদচারণা, তখন জনশক্তি খাতে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে গিয়ে তাদের এভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হবে কেন? কেন তাদের এভাবে প্রবাসে পদে পদে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হতে হবে? কেন আমাদের নারীরা মরু প্রান্তরে গুমরে গুমরে কাঁদবে? আমরা দেখছি, গৃহকর্মীদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কারণে ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলংকা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ যেখানে সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশ সেখানে এখনও কেন দ্বিধাগ্রস্ত? আরও ক্ষোভ ও হতাশার বিষয়, সৌদি আরবের নারী শ্রমিকরা তাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের কোনও প্রতিকারই পাচ্ছেন না।

আমাদের পররাষ্ট্র বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাব চাওয়ার সময় এসেছে, এই বিষয়ে তারা কী করেছে? নির্যাতিত নারীদের কেবল ফেরত এনেই দায়িত্ব শেষ? আমরা মনে করি, নারীরা যেন প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার না হন, সে জন্য এই খাতে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আর প্রতারণা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension