মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধ হলো ‘জিহাদ’: পশ্চিম পাকিস্তানের বিজ্ঞাপন

স্মৃতির ঝলকে ১৯৭১ সালের ১৪-১৮ ডিসেম্বর ডন পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনগুলোয় 'অন্ধকার সময়'

জাহান আরা দোলন: ১৯৭১ সালে নির্বিচারে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন, লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষণকে পাকিস্তানিরা ‘জিহাদ’ বলে আখ্যায়িত করে জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত লন্ডনের ‘ডন’ পত্রিকায় এই বিজ্ঞাপনগুলো প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রত্যেক শ্রেণির মানুষকে তার সম্পদের কমপক্ষে ১০ ভাগ দান করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, বেশী দান করলে আল্লাহ পুরস্কার দেবেন। অতীতের ধর্মীয় যুদ্ধে ইসলামের খলিফাদের সম্পদ দানের উদাহরণও টানা হয় ওই সব বিজ্ঞাপনে। ডন পত্রিকা এটিকে ‘অন্ধকার সময়’ বলে উল্লেখ করে।



জিহাদ শিরোনামে হাবিব ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘যখন মুসলিমরা জিহাদ পরিস্থিতিতে থাকেন, তখন সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশের সময় হয়ে যায়। আসুন, আমরা প্রত্যেকে সেই কাজ করি…। হাবিব ব্যাংক জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিলে ২ কোটি ৪৬ লাখ রুপি দিয়েছে। হাবিব ব্যাংকের কর্মীরা শুধু তাদের বেতন থেকেই অর্থ দেননি, বরং তারা বাইরে থেকেও তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে। হাবিব ব্যাংকের সব শাখায় দান নেওয়া হচ্ছে।’


সাবান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডারবার সোপ ওয়ার্কস লিমিটেডের বিজ্ঞাপনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বক্তব্য প্রচার করে বলা হয়, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর অঙ্গীকার স্মরণ করুন যে ন্যায়বিচারের পথে আপনি যদি অটল হন, তবে আল্লাহ আপনাকে চূড়ান্ত বিজয় দান করবেন। আল্লাহ আকবর বলে এগিয়ে যান, শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’


তহবিলে অর্থ দান করার আবেদন জানিয়ে ইউনাইটেড ব্যাংক বিজ্ঞাপনে জানায়, তারা ১ কোটি ৩২ লাখ রুপি দান করেছে। বিজ্ঞাপনটির ভাষা ছিল এমন, ‘এই যুদ্ধে আমাদের প্রত্যেকের অংশ নেওয়া দায়িত্ব। আমাদের গাজীরা মাতৃভূমিকে রক্ষা করছে, তাদের সফলতার জন্য আমাদের অবদান রাখতে হবে।’

তহবিলে অর্থ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিল ‘সিলভার বুলেট’। বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কায়েদ-ই-আজম (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদ-ই-আজম বলা হয়) বলেছিলেন, ‘আমাকে সিলভার বুলেট দাও এবং আমি তোমাদের পাকিস্তান দেব।’ পবিত্র ভূমির সম্মান ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য রুপালি বুলেটের আবারও প্রয়োজন আজ। একই ব্যাংকের আরেক বিজ্ঞাপনে কায়েদ-ই-আজমের বাণী তুলে ধরা হয়, ‘মুসলিমরা কখনো ধ্বংস হতে পারেন না। গত এক হাজার বছরেও কোনো শক্তি তাদের ধ্বংস করতে পারেনি। এটা স্বপ্ন ও অলীক ভাবনা। ঝেড়ে ফেলুন তা…আমাদের ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ইসলামি আদর্শ আমাদের পরিচালনাকারী শক্তি…।’

 

 

রিজভি চেম্বারের রিজভি ব্রাদার্সের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইনশাআল্লাহ, আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। যখন আমাদের বীর বাহিনীর সদস্যরা শত্রুকে নিজ এলাকায় বিনাশ করছে, সমস্ত জাতিকে তখন পাহাড়ের মতো বীরদের পাশে থাকা উচিত। আমরা স্থির প্রতিজ্ঞ এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে ইনশাআল্লাহ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর সহায়তায় আমরা কাপুরুষ শত্রুকে চরমভাবে পরাজিত করব।

 

করাচির ভিক্টোরিয়া রোডে সদর পোস্ট অফিসের বিপরীতে অবস্থিত ‘গিলমার টেক্স শো রুম’ এর আফতাব শফিক ওমর শফিক এন্ড ব্রাদার্স এর পক্ষ থেকে মেয়েদের জিহাদে অংশগ্রহণ করবার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ইসলামের পথের যোদ্ধাদের জন্য ৪০” বুকের মাপের পশমী কাপড় উদারতার সাথে দান করুন। পশমী কাপড় তৈরির খাঁটি পাহাড়ি উল এখানে হ্রাসকৃত মূল্যে পাওয়া যায়।

জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিলকে সম্মান প্রদর্শন করতে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড তাদের প্রত্যেক শাখায় দানের অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করে। সকল সাধারণ পাকিস্তানি জনগণের প্রতি আবেদনে তারা ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে। বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করে, হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর সময়ে যখন জিহাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছিল তখন হযরত আবু বকর তার সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দিলেন এবং হযরত ওমর তার সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেকটা দিয়ে দিলেন। আজ আমাদের এই আবেদন সকল পাকিস্তানি জনগণের প্রতি: ধনী অথবা গরিব, ব্যবসায়ী অথবা জমিদার সকলেই যেন তার সম্পত্তির ১০% জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিলে দান করেন। যিনি যত বেশী দান করবেন, তিনি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে তত ভালো প্রতিদান লাভ করবেন। আজ আমাদের বীর যোদ্ধারা আমাদের জীবন এবং আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে নিজেদের জীবন উতসর্গ করছেন। সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে জাতীয় প্রতিরক্ষা তহবিলে আমাদের উদার ভাবে দান করা অবশ্য কর্তব্য।

ইয়াহিয়া খানের ছবিযুক্ত একটি বক্তব্যও তারা এখানে উদ্ধৃত করে, ‘দিন রাতের প্রতি মুহূর্তে তোমার নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত: জাতির এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমি কি করতে পেরেছি ?’

ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড কায়েদ এ আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে, ‘মুসলমানদের ধ্বংস করা সম্ভব নয়। গত ১,০০০ বছরেও কোনও শক্তিই তাদের ধ্বংস করতে পারে নি। এটা একটা বিভ্রান্তিমূলক ধারণা এবং আকাশকুসুম স্বপ্নে তারা ঢাকা পড়ে গেছে ….আমাদের ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি এবং ইসলামের আদর্শই আমাদের চালিকাশক্তি…।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension