
হাতকড়া ও শিকল পরিয়ে আরও ৩০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র
বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাসের অভিযোগে হাতকড়া ও শিকল পরিয়ে আরও ৩০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বহনকারী বিশেষ ভাড়া করা বিমানটি বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তাদের মধ্যে ২৯ জন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। রানওয়ে পর্যন্ত শিকল পরিয়েই তাদের আনা হয়েছে। এরপর রানওয়ে থেকে শিকল খুলে অ্যারাইভাল গেটে আনা হয়। এ সময় কাউকে তাদের কাছে যেতে দেয়া হয়নি। কাউকে কোনো ধরনের ছবি তুলতেও দেয়া হয়নি।
ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক দফায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসে অন্তত ১৮৭ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর তথ্য জানা গেছে। প্রথম দিকে হাতকড়া ও শিকল না পরানো হলেও ২রা আগস্ট একটি সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ সি-১৭ করে এক নারীসহ ৩৯ বাংলাদেশিকে দেশে পাঠানো হয়। তাদের সবার হাতকড়া ও শিকল পরানো ছিল।
ফেরত আসাদের মধ্যে নোয়াখালীর ২২ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ্ বিমানবন্দরে বলেন, লম্বা যাত্রায় পুরোটা সময় হাতে-পায়ে আসামিদের মতো শিকল পরিয়ে রেখেছিল। একদিকে দেশে ফেরত আসার হতাশা, তার ওপরে সন্ত্রাসীদের মতো হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে দেশে আসার ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কারও না হোক। ফেরত আসা ব্যক্তিরা জানান, প্রায় ৬০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রায় তাদের হাতকড়া ও শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রণা নিয়ে বসে থাকতে হয়েছে। খেতে দেয়া হয়েছে শুধু রুটি আর পানি। এমনকি টয়লেটে যাওয়ার সময়ও একজন অফিসার নিয়ে যেতেন, আবার শিকলে বেঁধে দিতেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র বলছে, রাত সাড়ে ১২টার পর বিমানটি নামলেও তিন ঘণ্টা সেটি রানওয়েতে ছিল। এ তিন ঘণ্টায় তাদের হাতকড়া ও শিকল খোলা হয়নি। বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল এরিয়াতে পৌঁছানোর আগেই সবাইকে শিকলমুক্ত করে দেয়া হয়। পরে রাত ২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে তাদের বিমানবন্দরে আনা হয়। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ টিম, কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ টিম এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের পক্ষ থেকে তাদের বাড়ি পৌঁছানোর অর্থ সহায়তা দেয়া হবে।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও এইচএসআইএ’র ইমিগ্রেশন বিভাগের সূত্র বলছে, চলতি বছরের ৮ই জুন একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে ৬ই মার্চ থেকে ২১শে এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে আরও অন্তত ৩৪ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ১৮০ ছাড়িয়েছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হলে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কারণে চার্টার্ড ও সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বেড়েছে। বেশির ভাগ অভিবাসী মেক্সিকো বা লাতিন আমেরিকার দেশ বা অন্য কোনো পন্থায় ৩০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। বৃহস্পতিবার ফিরে আসা কর্মীদের বড় একটি অংশ জানিয়েছিল তারা মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে মেক্সিকোতে মাফিয়াদের কাছে আটক হয়। অন্তত ছয়জন জানিয়েছে- তাদের জিম্মি করে, অত্যাচার করে পরিবারের থেকে ৪০-৫০ লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছে।
২০১৬ সালে ২৭ বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে। তারা বিশেষ ফ্লাইটে এসেছিলেন, আর যাত্রাপথে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল। এ দৃশ্য তখন দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এভাবে শিকল পরানোয় মানবাধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন, যা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে আলোচনাও হয়েছিল। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রত্যাবাসনের সময় হাতকড়া ও শিকল ব্যবহার উচিত নয়। সাধারণ অভিবাসীদের হাতকড়া বা শিকল পরিয়ে ফেরত পাঠানোটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থি।



