যুক্তরাষ্ট্র

হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধ চান না ট্রাম্প, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বার্তা পাঠিয়ে এই যুদ্ধে না জড়ানোর অনুরোধ করেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প। তবে মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার অনুরোধ করলেও ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বড় অংশ এখন বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরনির্ভর। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন হুতিদের হাতে চলে যাওয়ায় নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আজ শনিবার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন সফরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘হুতিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। তারা চায় না আমরা তাদের বিরুদ্ধে যাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।’ একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিজের ‘বন্ধু’ বলেও উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তবে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন, সময় কিংবা আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। হুতি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

সৌদির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দুবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প এই সংঘাতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রাজি হননি। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরেকটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে আরও ব্যয়বহুল হবে।

হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাক্সিওসের এই প্রতিবেদন নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের পর সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হয়ে উঠেছিল বাব আল-মান্দেব প্রণালি। ইয়েমেন, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ সমুদ্রবাণিজ্য এবং ইউরোপ-এশিয়ার বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন এই পথ দিয়ে হয়। ফলে হুতিরা যদি এই করিডর বন্ধ করে দেয়, তাহলে শুধু সৌদি আরব নয়, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার জ্বালানি সরবরাহও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

সৌদিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
হুতিরা চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের একাধিক তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সফলভাবে আঘাত হেনেছে।

এর জবাবে সৌদি আরব দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। সরকার এটিকে ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ বলে বর্ণনা করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, কয়েকটি ড্রোন ইরাকের দিক থেকে প্রবেশ করেছিল। তবে তারা তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়নি, বরং ইরাক সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে।

কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও মিসর সৌদির ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

হুতিদের শক্তি কোথায়
হুতি আন্দোলন ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই গোষ্ঠী গত কয়েক বছরে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের প্রতিবাদে তারা বহু বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হলে হুতিরা প্রকাশ্যে তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌদি ও পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজেও আক্রমণ শুরু করে। ইরানের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’-এর মধ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহর সক্ষমতা দুর্বল হলেও হুতিরা এখন সবচেয়ে কার্যকর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension