
১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ
জাহান আরা দোলন: আজ ১৮ ডিসেম্বর। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর।এদিন সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রথম কার্যক্রম শুরু করে।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
সকালে বাংলাদেশ সরকারের নব-নিযুক্ত মহাসচিব দুই নব-নিযুক্ত মহাসচিব রুহুল কুদ্দুস এবং পুলিশের আই. জি আবদুল খালেক ঢাকা এসে পৌঁছেন। সারা ঢাকা শহরে বিজয়-আনন্দে মুক্তিযোদ্ধারা আকাশে গুলি ছুঁড়ছিল।
নব-নিযুক্ত মহাসচিব রুহুল কুদ্দুসের জারি করা এক আদেশে কোলকাতা থেকে প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আট শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকা আসেন। তাদের লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বিজয়ের পর মুক্ত ঢাকায় এটিই বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের প্রথম কর্মকাণ্ড।
মন্ত্রিপরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে রুহুল কুদ্দুস সেদিন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। আর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন আবুল ফাতেহ।
এদিন হানাদার মুক্ত হয় রাজশাহী। মুক্তিবাহিনী, মিত্রবাহিনী ও গেরিলা যোদ্ধাদের ক্রমাগত আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদররা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও রাজশাহীতে স্বাধীন দেশের প্রথম পতাকা ওড়ে দু দিন পর। কেননা বিহারী, পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারা এক হয়ে যুদ্ধ অংশ নেয়। রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলেন লাল গোলা সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী ছেড়ে চলে যায় নাটোরে। তাদের দোসররা এখানে সেখানে লুকিয়ে যায়। খাদ্য সংকট এড়াতে বিভিন্ন পাড়া মহল্লা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়।
ইন্টার-কন্টিনেন্টাল হোটেলে আশ্রয় নেয়া প্রাক্তন গর্ভনর ডা. এ. এম. মালিককে মুক্তিযোদ্ধারা ছিনিয়ে নিতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে হোটেলের সামনে চারটি রুশ নির্মিত ট্যাংক মোতায়েন করে প্রহরা বসানো হয়।
পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে বাংলাদেশিদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম কর্মকর্তা আবুল ফাতেহ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাগদাদের দায়িত্বরত ছিলেন। একাত্তরের জুলাইয়ে তিনি পক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে লন্ডনে চলে যান।মুজিবনগর সরকার শুরুতে আবুল ফাতেহকে অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেয়। আগস্টে তিনি প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব।
প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে প্রখ্যাত ফরাসি লেখক ও বুদ্ধিজীবী আন্দ্রে ম্যালর ভারতের প্রতি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গীর তীব্র সমালোচনা করেন। একইসঙ্গে তিনি ওই চিঠিতে বাংলাদেশের যৌক্তিকতা সমর্থন করেন। এর আগে তিন মাস আগে তিনি বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের পক্ষে তার লড়াই করতে চাওয়ার প্রতিশ্রুতি কোনও ফাঁকা বুলি ছিল না। তিনি জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া দেড়শ’ অফিসার তার সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পাকিস্তানকে অবশ্যই মুজিবকে মুক্তি দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা বদ্ধ-দুয়ার খুলে দেয়। কিন্তু মূল কাজ শুরু হয় এর পরে।’
ঢাকা পৌঁছানোর পর তারা চলে যান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, বাঙালির যে স্মৃতির মিনার পাকিস্তানি বাহিনী ভেঙে দিয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা।❐



