
৪১ হাজার কোটি টাকার পিইডিপি-৫ অনুমোদন: নির্মাণ হবে ১৫ হাজার শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকেরা পাবেন ট্যাব
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার এতে অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঋণ ও অনুদানের বিষয়ে আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদ্যালয়ে সব শিশুর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার হার কমাতে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) গ্রহণ করেছে সরকার।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে সারা দেশে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কর্মসূচিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দেওয়া হবে। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার এতে অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঋণ ও অনুদানের বিষয়ে আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একনেক সভায় কর্মসূচিটি জরুরি বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হলেও বিভিন্ন ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে দুই সপ্তাহের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ৪৩৬ কোটি টাকার বেশি পরামর্শক ব্যয় যৌক্তিকীকরণ, পরিচালন প্রকৃতির ব্যয় রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর এবং আগের দুটি প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির সমাপ্তি প্রতিবেদন দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুমোদিত কর্মসূচিটি নিয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
তিনি জানান, পিইডিপি-৫ একটি বড় কর্মসূচি। এর আওতায় একাধিক প্রকল্প ও কার্যক্রম রয়েছে। কর্মসূচিটি পরিকল্পনা কমিশনে আসার পর বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংশোধিত প্রস্তাব পুনরায় জমা দেওয়া হলেও দ্বিতীয় দফা পর্যালোচনায় আরও কিছু বিষয়ে আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ জানানো হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৪৩৬ কোটি টাকার পরামর্শক প্যাকেজসহ কয়েকটি খাতে ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে আগেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। দ্বিতীয় দফা পর্যালোচনাতেও এসব বিষয়ে পুনরায় পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব পদ বা কার্যক্রমের ব্যয় রাজস্ব খাত থেকে বহন করা প্রয়োজন, সেগুলো আগামী দুই বছরের মধ্যে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরবর্তী কার্যক্রম এবং প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
পিইডিপি-৫ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের সব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।”
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তি ও সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য দেশের সব শিশুর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থী যাতে সফলভাবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাচক্র সম্পন্ন করতে পারে এবং কোনো শিশু মাঝপথে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষা, গণিতসহ মৌলিক বিষয়ে শিখনদক্ষতা বাড়াতে আধুনিক পাঠ্যক্রম, যুগোপযোগী পাঠদান ও নিয়মিত মূল্যায়নব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁদের ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলের পোশাক, ব্যাগ ও জুতা সরবরাহের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে নতুন শ্রেণিকক্ষ, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ের শিক্ষা অফিসগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও তদারকি সক্ষমতা জোরদার করাও এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
নির্মাণ হবে ১৫ হাজার ৬৪১টি শ্রেণিকক্ষ
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, পিইডিপি-৫-এর আওতায় সারা দেশে ১৫ হাজার ৬৪১টি নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে ১ হাজার ৫০০টি ওয়াশ ব্লক, ১০ হাজারটি সীমানাপ্রাচীর, ২০টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, ১২৫টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং ১০০টি ইউপিআরটিসি ভবন নির্মাণ করা হবে।
পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, অস্থায়ী বিদ্যালয় স্থাপন এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামতের উদ্যোগও রয়েছে কর্মসূচিতে।
এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারঅ্যাকটিভ প্যানেল
পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় দেশের ২০ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলা হবে।
এসব বিদ্যালয়ে ইন্টারঅ্যাকটিভ ফ্ল্যাট প্যানেল (আইএফপি) স্থাপনের পাশাপাশি ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগের আওতায় শিক্ষকদের ট্যাব দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াই-ফাই ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষকদের ট্যাব, ২০ হাজার বিদ্যালয়ে আইএফপি এবং মাঠপর্যায়ের শিক্ষা দপ্তরগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার জন্য মোট ১ হাজার ১৮৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন, পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিখনফল উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পোশাক ও শিক্ষা উপকরণে ১০ হাজার কোটি টাকা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির অন্যতম বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাক, ব্যাগ, জুতা ও মোজা বিতরণের জন্য ১০ হাজার ৬৫ কোটি ২১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়কেন্দ্রিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘একটি শিশু একটি গাছ’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে বিকল্প পানির উৎস তৈরি, নলকূপ স্থাপন এবং পানির গুণগত মান পরীক্ষার কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একটি শিশু একটি গাছ
শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘একটি শিশু একটি গাছ’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আওতায় দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষার্থী একটি করে গাছ রোপণ করবে।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৫৩ কোটি ৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য থেকে ২৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা দেওয়ার সংস্থান রাখা হয়েছে।
৪৩৬ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
কর্মসূচিটির ব্যয় কাঠামো নিয়ে একনেক ও পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে পরামর্শক ব্যয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকল্পে ৪৩৬ কোটি টাকার বেশি পরামর্শক ব্যয় রাখা হয়েছে, যা যৌক্তিকীকরণের প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ব্যয় পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কর্মসূচির আওতায় এমন কিছু ব্যয় রয়েছে, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে নিয়মিত পরিচালন বা রাজস্ব ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যয় প্রকল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল না রেখে দুই বছরের মধ্যে নিয়মিত রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আগের দুটি কর্মসূচি—তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৩) ও চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) দ্রুত চূড়ান্ত করে দাখিলের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিক কর্মসূচি হিসেবে পিইডিপি-৫-এর নাম পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিপুল অর্থের এ কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন চূড়ান্ত করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।



