বাংলাদেশ

কারাবাস শেষে আরেক ‘কারাগারে’

উৎপল রায়

জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টা কেটেছে কারাগারের ভেতরে। কোনো অপরাধের সাজা খাটতে তাদের অধিকাংশই কারাগারে ঢুকেছেন প্রথম যৌবনে। দুই যুগ কারাবাস শেষে তারা যখন মুক্ত জীবনে ফিরে এসেছেন, তখন মধ্যবয়স পেরিয়ে গেছে। সমাজের মূল স্রোতে তারা আর ফিরে আসতে পারছেন না। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। একধরনের মানসিক শূন্যতা তাদের গ্রাস করে। গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কমপক্ষে ১৭ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত কারাবাসের (খালাস কিংবা সাজা শেষ) পর মুক্ত হয়েছেন, গত দেড় বছরে এমন ১১ জনের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হয়। কয়েক মাসে ঢাকা, রাজশাহী, লক্ষ্মীপুরে গিয়ে তাদের অনেকের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করেছেন এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, মুক্ত জীবনে ফিরলেও তাদের ‘সাজা’ শেষ হয় না। সামাজিক অবমাননা আর অবসাদ তাদের মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন এক জীবনে ঠেলে দিয়েছে। স্বাভাবিক কর্মজীবনেও তারা আর ফিরতে পারেন না। এভাবে বাকি সময়টা তাদের ‘আরেক কারাজীবন’ বরণ করতে হয়। তারা সমাজের মূলধারায় আসতে তো পারেনই নি, হয়ে পড়েছেন পরিবার ও সমাজের বোঝা। তারা এক প্রকার ‘অচ্ছুৎ’ হয়ে নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছেন।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের ৬৭টি কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৭২। এর মধ্যে পুরুষ ১৮ হাজার ৫২৫ জন। কয়েদিদের মধ্যে আড়াই হাজারের মতো মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে সশ্রম সাজাপ্রাপ্ত ৪ হাজার ৬৬৩ এবং বিনাশ্রম সাজাপ্রাপ্ত ২৯ হাজার ১৮৯ জনসহ ৩৩ হাজার ৮৫২ জন মুক্ত জীবনে ফিরেছেন।

‘কোন শামসু, জেলখাটা শামসু?’
রাজশাহীর তানোরের শামসুদ্দিন দর্জি ওরফে শামসু। গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তার গ্রামের বাড়িতে কথা হয় তার সঙ্গে। রাজশাহী শহর থেকে তানোর উপজেলা বাজার হয়ে নওগাঁমুখী সড়কে গোকুল মোড়। ডানদিকে এক কিলোমিটার পার হয়ে গোকুল মথুরা বাজার। শামসুর বাড়ি কোনটি জিজ্ঞাসা করলে মধ্যবয়স্ক দুজন ব্যক্তি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কোন শামসু, জেলখাটা শামসু?’ স্ত্রী হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে প্রায় ২৩ বছর ৭ মাস সাজা খেটে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। সব হারিয়ে এখন জীবনের হিসাব খোঁজেন তিনি। অনেকটা ভবঘুরে জীবন তার।

শামসুকে বাড়িতে না পেয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা যায়, স্থানীয় একটি বিলে মাছ ধরতে গেছেন তিনি। অনেক চেষ্টা করে গোকুল গ্রামের ছোট বাজারের একটি চায়ের দোকানে কথা হয় শামসুর সঙ্গে। জেলে গিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সে। এখন তার বয়স ৫৩ বছর। গায়ের রঙ তামাটে হয়ে গেছে। বিভিন্ন রোগে শরীর ভেঙে পড়েছে। লিকলিকে ও হালকা শরীরে শক্তি নেই বললেই চলে। স্মৃতি দুর্বল। কথা বলার সময় অবসন্ন মনে হলো তাকে। কথাবার্তায় কিছুটা অসংলগ্নতা। শামসু জানান, কারাগার থেকে বেরোনোর পর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা দুটোই হারিয়েছেন। এখন কোনো কাজে উৎসাহ পান না। প্রতিবেশীরা বিশ্বাস করে নির্ভর করার মতো কোনো কাজে ডাকে না। পারিবারিক, সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও তার ডাক পড়ে না। লোকে অস্বস্তি বোধ করে। তাকে বেশিরভাগ সময় চলতে হয় চেয়েচিন্তে। মাঝেমধ্যে মাটি কাটা, কৃষিকাজ, মাছ ধরে চালাতে হয় সংসার। কারাবাস শেষে বিয়ে করেছেন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সামান্য জমিতে টিনের ছোট একটি ঘরে স্ত্রী ফরিদা আক্তার, ৩ ও ১ বছর বয়সী দুই কন্যাকে নিয়ে তার অগোছালো সংসার।

১৯৯৫ সালের ২২ মার্চ স্ত্রী রূপজান বিবিকে হত্যার অভিযোগে বিচারিক আদালতে শামসুর যাবজ্জীবন সাজার রায় হয় ১৯৯৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। কারাগারে যাওয়ার ১০ দিনের মাথায় ৭ দিন বয়সী কন্যাসন্তানের মৃত্যুর খবর পান। ২০০৭ সালে পান বাবা জালেফ দর্জির মৃত্যুর খবর। কিন্তু মৃত সন্তান ও বাবার মুখ দেখার সুযোগ হয়নি তার। দ্বিতীয়বার বিয়ে করে নতুন করে জীবন শুরু করতে গিয়ে শামসু দেখছেন তার সন্তানদের সামাজিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জেল খাটা শামসুর মেয়ে’।

তিনি জানান, কারাগার থেকে মুক্তির দিন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে একটি প্যাডেলচালিত ভ্যান দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট, শারীরিক অক্ষমতা এবং আর্থিক অনটনে সেটি বিক্রি করে দেন। কারাগারে শীতলপাটি বোনার কাজ শিখলেও এ কাজের এখন আর তেমন গুরুত্ব নেই।

শামসু এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওখানে (কারাগার) তিন বেলা খাবার পাইছি। সবাই আমারে খুব আদর করত। ওখানে অনেকে সিস্টেম কইরে ইনকাম করে। কিন্তুক আমি কোনো দিন ইনকাম করি নাই। বাড়ি থেকে এইটা-সেইটা দিত। সৎ ভাই মাঝেমধ্যে দেহা করত। ছোট ভাই খোঁজখবর রাখত। এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমার তো আর কিছু নাই। কেউ যদি আমারে একটা কাজকাম দিত, তাইলে বউ-বাচ্চারে নিয়ে খাইতে পারতাম।’

মায়ের জন্য বাঁচতে চান মিলন কামাল
অপহরণের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ২৪ বছর কারাগারে ছিলেন মিলন কামাল। তার খোঁজে গত ২২ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদক লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামে গেলে গ্রামবাসী উৎসাহী হয়ে ওঠেন। গ্রামে তাকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। মিলন কামালের সঙ্গে কথা হয় তার ভাঙাচোরা ঘরে বসে। বয়স এখন ৫৭ বছর। লিকলিকে শরীরে এখনই বার্ধক্য ভর করেছে। একমাত্র পুরুষ্ট গোঁফই তার অতীতের সুঠাম দেহের সাক্ষ্য বহন করছে। কর্মস্পৃহা হারিয়েছেন কারাগারেই। মানসিকভাবেও এখন অপ্রকৃতিস্থ। রোগে আর অনটনে এখন পর্যুদস্ত তিনি। বাবার রেখে যাওয়া জমিতে একটা ছোট টিনের ঘর। ঘর বলতে ভাঙাচোরা বেড়া আর টিনের চালায় অসংখ্য ফুটো। বৃষ্টি হলেই এখানে-সেখানে থালা বাটি দিতে হয়। তখন রাত কাটে নির্ঘুম।

প্রথম যৌবনে লক্ষ্মীপুর শহরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন মিলন। ১৯৯৭ সালের আগস্টে শিশু অপহরণের মামলায় ৩১ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হন। ২০০৩ সালে বিচারিক আদালতে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। এরপর উচ্চ আদালতেও সেই রায় বহাল থাকে। মিলন কামাল দৃঢ়ভাবে দাবি করে বলেন, তিনি পরিস্থিতির শিকার। অপহরণ তিনি করেন নি। কারাগারে যাওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় তার স্ত্রী সালেহা বেগম বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বিনা চিকিৎসায় সাড়ে তিন বছরের মেয়ে কামরুন্নাহার নেকির মৃত্যু হয়, সেই খবর পান কারাগারে বসে।

২৪ বছর সাজা খাটা শেষে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট তিনি লক্ষ্মীপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান। কারামুক্তির সময় তার ইচ্ছা অনুযায়ী কারা অধিদপ্তর, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে আব্দুল্লাহপুর গ্রামে তাকে একটি ছোট সেলুনের দোকান করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাজারটি মূল শহর থেকে দূরে। সেলুনে দিনে রোজগার হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সব দিন কাজ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে বাড়তি কাজ হিসেবে মাটি টানা, ইট ভাঙাসহ নানা ভারী কাজ করতে হয়। কিন্তু বয়স ও শারীরিক অক্ষমতায় সেটিও সম্ভব হয়ে ওঠে না। মিলনরা সাত ভাইবোন। ভাইয়েরা স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী। সবারই পৃথক সংসার। মিলনের কারণে তাদের পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় হতে হচ্ছে বলে মনে করেন পরিবারের সদস্যরা।

প্রায় দুই যুগ একটা বদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন জীবন কাটিয়ে যে দিন মুক্ত পৃথিবীতে বেরিয়ে আসেন মিলন, সেই দিনটার কথা তার খুব মনে পড়ে। তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১১টার দিকে মুক্তি পাই। বাড়িতে এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নকাটি করি। মাও দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হন। আইস্যা দেখি শুধু ভাঙাচোরা ঘরটাই আছে। কারাগারে থাকতেই বয়স শেষ। এহন আর কেউ কাজ দেবে না। কী করব, কী খাব, তা নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না। চিন্তা এহনো আছে। এক বছর আগে আবার বিয়া করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঈদে স্ত্রীরে একটি শাড়ি দিতে পারি নাই। মায়ের অসুখের সমস্যা। তারে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হয়।’ বলেন মিলন।

মিলন জানান, কারাগারে যাওয়ার কিছুদিন পর পরিবারের দু-একজন সাক্ষাৎ করতে এলেও একটা পর্যায়ে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কেবল মা মোর্শেদা বেগমের উৎসাহ কমেনি। কয়েক মাইল দূরের কারাগারে হেঁটে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন মা। মিলনের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশের ঘরে তার মা মোর্শেদা বেগম গোঁঙাচ্ছিলেন। অশীতিপর এই বৃদ্ধার দিনরাত কাটে বিছানায়। কথা বলার শক্তি নেই।

মিলনের স্ত্রী পিংকী বলেন, ‘এই মানুষটার (মিলন) মন ভালো। তারে আমি ছাইড়া যাব না।’ মিলন বলেন, ‘মেয়েটা আমার না খাইয়া চিকিৎসা ছাড়াই মরছে। মেয়েটার মুখটা একটু দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগও পাইনি। এখন মায়ের মধ্যে মেয়েরে খুঁজি। যত দিন পারি মায়ের সেবা যত্ন করতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নাই। একটা কাজ চাই, যাতে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারি।’

ঘরহীন আনোয়ারের রাত কাটে অন্যের বারান্দায়
২০০৫ সালে রাজধানীর শাহজাহানপুরে অজ্ঞাত এক লাশ পাওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন ও তার বন্ধু জাকির হোসেন। ১১ বছর পর ২০১৬ সালের ২১ মার্চ ঢাকার একটি বিচারিক আদালত দুজনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়। পাঠানো হয় ফাঁসির সেলে। এর ছয় বছর পর ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক রায়ে আনোয়ার ও জাকিরকে খালাস দেওয়ার পর ওই বছরের মার্চে দুজনই মুক্তি পান। মামলার তদন্ত ও বিচারিক আদালতের রায়ের ত্রুটির বিষয়টি উঠে আসে হাইকোর্টের রায়ে। তত দিনে ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। আনোয়ারের বয়স এখন ৪৩ বছর।

১৯৯৫ সালে লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় একটি স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেন নি আনোয়ার। তখন তার নাম ছিল শঙ্কর দেবনাথ। কিছুটা বেখেয়ালি হয়ে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে শঙ্কর দেবনাথ থেকে হয়ে যান আনোয়ার হোসেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে বাবা তাকে ত্যাগ করেন। ২০০২ সালে আনোয়ারের বাবা-মা ও ভাইবোন লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থেকে ভারতের ২৪ পরগনায় চলে যান। সেই থেকে তাদের সঙ্গে আনোয়ারের যোগাযোগ নেই।

আনোয়ারের ১৭ বছরের কারাজীবনের ৬ বছর কেটেছে কনডেমড সেলের নির্জন প্রকোষ্ঠে। আনোয়ার এখন থাকেন ধানমন্ডি ১০/এ (পুরনো ১৯ নম্বর রোড) মধুবাজার এলাকায়, ২৪৫/১ নম্বর ভবনে। ওই ভবনের নিচতলায় একটি অনলাইন পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পাঞ্জাবির কারিগর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রাত কাটে ওই ভবনের নিচতলার বারান্দায়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর ওই এলাকায় কথা হয় আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুর্মূল্যের এই বাজারে অল্প মাইনায় তার চলে না। নিজেই রান্না করে খান। প্রায় দেড় দশক কারাবাসে মানসিক সক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি। ছোটখাটো গড়ন, দুর্বল রোগা শরীরের আনোয়ার এখন নানা রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে ডায়াবেটিস। তিনি বলেন, ‘কনডেমড সেলে যারা থাকেন, তাদের কোনো কাজ শেখানো হয় না। সেলে দিনরাত বসে, শুয়ে, ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। কনডেমড সেলে প্রতিটি দিন মৃত্যুর প্রহর গুনেছি। আমি ফাঁসির দড়ির কাছাকাছি গিয়েছি। কিন্তু ভাগ্য আমাকে মুক্তি দিয়েছে।’

আনোয়ার বলেন, ‘কারাগার থেকে বেরিয়ে কিছু দিন যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগে ছিলাম। কিন্তু লোকজনের নানা জিজ্ঞাসা, বাঁকা উক্তি : ‘কেন কারাগারে ছিলাম? কী অপরাধ করেছিলাম? কেন এমন হলো? আসলেই খুন করেছিলাম কি না?’

তিনি বলেন, ‘এমন অবস্থা হয়েছিল, সেখানে আমাকে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। কাজ দেয় না। তখন ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ধানমন্ডিতে চলে আসি। এখানে থাকি, কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলি না। এই যে আপনি (প্রতিবেদক) আসলেন কাউকে বলিনি। যে কয়জন জানে তারা নানা প্রশ্ন করে। আমার অতীত বলতে ভালো লাগে না।’

গরু লালন-পালন করেন ইসমাইল ও সোনারদী
২০২২ সালের আগস্টে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ইসমাইল হোসেন বাবু ও মো. সোনারদী ওরফে সোনারুদ্দি মুক্তি পান কারাগার থেকে। এর আগে ১৪ বছরের বেশি সময় কনডেমড সেলে কারাভোগ করেছেন মৃত্যুদন্ডের রায় নিয়ে। দুজনের বাড়ি মোহনপুর ইউনিয়নের ধোয়াপাড়া-যৌবনলাইন গ্রামে। প্রায় ২০ মাস পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্ত জীবনে ফিরলেও দুজনের কেউই সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে পারেন নি। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে প্রশিক্ষণের বিধান নেই। এ কারণে দুজনের কেউই সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন, সংশোধন কিংবা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পান নি। এখন গ্রামের বাড়িতে তারা গরু পালন করেন। সপ্তাহে দু-এক দিন অন্যের জমিতে কাজ করেন।

হত্যা মামলায় ২০০৮ সালের ১৩ মার্চ ফাঁসির রায়ের পর দুজনের ঠাঁই হয় রাজশাহী কারাগারে। ২০২২ সালের ২৩ জুন উচ্চ আদালতের রায়ে দুজন খালাস পান এবং এর কিছুদিন পর কারামুক্তি মেলে তাদের। ইসমাইলের বয়স এখন ৪০ বছর। আর সোনারুদ্দির ৫২ বছর। ওই বছরের মধ্য আগস্টে তাদের গ্রামের বাড়িতে গেলে এই প্রতিবেদককে তারা বলেছিলেন, তারা যেহেতু এখন আর আসামি নন, তাই সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে চান। কাজ করে জীবিকা চালাতে চান। কিন্তু ‘জেল খাটা আসামি’ বলে তারা এখনো মানুষের সন্দেহ, সংশয়ের মধ্যে থাকেন। কেউ তাদের কাজে ডাকে না। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের ডাক পড়ে না।

সর্বশেষ অবস্থা জানতে সম্প্রতি তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ইসমাইল হোসেন জানান, দীর্ঘদিনের কারাজীবন শেষে বাড়িতে এলেও শারীরিক ও মানসিক শক্তি হারিয়েছেন। ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। কারাগার থেকে বেরোনোর পর বিয়ে করেছিলেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে একটি গরু দেওয়া হয়। এখন সেটি লালন-পালন করেন। দিনরাতের বেশিরভাগ সময় ঘরেই কাটে। তিনি বলেন, জীবনের ১৪টি বছর অপচয় হয়েছে তার। এখন তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন না। কোনো কাজ করতে পারেন না। প্রায় একই কথা শোনালেন সোনারুদ্দি। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন তাকে শুয়ে-বসে কাটাতে হয়। গ্রামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া (বর্গা হিসেবে) একটি গরু লালন-পালন করেন। রাজমিস্ত্রি ছেলের রোজগারে তাকে চলতে হয়। কাজের ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক ও মানসিক অবসাদে কাজে আগ্রহ নেই। তিনি বলেন, ‘বয়স হয়েছে। এখন আর কাজে উৎসাহ পাই না। গরুটি দেখাশোনা করি। মাঝেমধ্যে কৃষিকাজ করি।’

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যারা দীর্ঘ কারাবাস করে, তারা দীর্ঘদিন সমাজবিচ্ছিন্ন থাকে। কারাগারে তারা একটা সাব কালচার (নেতিবাচক বিকল্প সংস্কৃতি) ধারণ করে। তাদের অনেকেই হয়তো বুঝে না বুঝে ভুল, অপরাধ বা পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু সমাজের চোখে তারা অপরাধী হিসেবে পরিচিত হন। এ কারণে তাদের মনঃকষ্ট, দুঃখ-বেদনা কাজ করে। মুক্তি পাওয়ার পরেও তারা একা হয়ে যায়।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, ‘অপরাধটা করে মানুষ। তদন্ত ও বিচারও মানুষই করে। অনেকে পরিস্থিতির কারণেও আইনের ফাঁকফোকরে পড়েন।’ তিনি বলেন, ‘অপরাধের বিচার বা সাজা যেমন থাকবে, তেমনি সাজা শেষ হলে তিনি তো আর দশটা মানুষের মতোই। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।’

দেশ রূপান্তর

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension