প্রধান খবরবাংলাদেশ

ত্রাণের টাকা বন্যার্তদের না দিয়ে ব্যাংকে কেন রেখেছেন সমন্বয়করা?

দেশের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্তদের সাহায্যার্থে গত আগস্টে গণত্রাণ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ ট্রাকভরে ত্রাণের মালামাল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সমাবেত হন।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ নগদ অর্থ দিয়েছিলেন ওই ত্রাণ তহবিলে। ছোট-বড় অনেকেই তখন নিজের জমানো অর্থ দান করতে মাটির ব্যাংক হাতে হাজির হয়েছিলেন টিএসসিতে, যা দেখে অনেকে আপ্লুতও হয়েছিলেন। কিন্তু ত্রাণ তহবিলে জমা পড়া সেইসব অর্থ বন্যার্তদের সহায়তায় ঠিকঠাক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা।

আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর)। এদিন সমন্বয়কদের দেয়া বার্তা থেকে জানা যায়, সংগৃহীত অর্থের বেশিরভাগই অব্যবহৃত অবস্থায় ব্যাংকে জমা রয়েছে। শনিবার রাতে ফেসবুকে দেয় এক পোস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, “ব্যয় বাদে বাকি টাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক শাখা, ইসলামী ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।”

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১ জেলার মানুষের জন্য টিএসসিতে গত ২২ শে আগস্ট গণত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পরবর্তী দুই সপ্তাহে ওই তহবিলে প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত বন্যার্তদের সহায়তায় খরচ হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অবশিষ্ট প্রায় নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

এ ছাড়া খাবারসহ সংগ্রহ হওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য প্রায় ১৯১টি ট্রাকে করে বন্যাদুর্গত এলাকায় নিয়ে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। আর চলতি মাসের শুরু দিকে দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় গত ০৪ সেপ্টেম্বরের পর নতুন করে আর গণত্রাণ সংগ্রহ করা হয়নি বলেও জানানো হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বন্যার্তদের সহযোগিতার উদ্দেশে গঠিত ত্রাণ তহবিলের যে নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছে, সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, “ত্রাণ সহায়তার জন্য যত অর্থ আমরা পেয়েছি, সেগুলোর প্রতিটি পয়সার হিসাব আমাদের কাছে আছে। কাজেই এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।”

তার কথায়, প্রাথমিক ত্রাণ কার্যক্রমে খরচের পর তহবিলের বাকি অর্থের বেশিরভাগই জমা রাখা হয়েছে জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায়। চাইলেও সেগুলো কেউ আত্মসাৎ করতে পারবে না। কারণ সেগুলো বিশেষভাবে খোলা হয়েছে, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও যুক্ত রয়েছেন। তিনিসহ আরও দুইজনের সম্মিলিত সিগনেচার ছাড়া কেউ টাকা তুলতে পারবে না।

এ ছাড়া অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তহবিলের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা ত্রাণ কার্যক্রমের আয় ও ব্যয়ের ওপর একটি অডিট করছি এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। সিএ ফার্মের প্রফেশনাল ব্যক্তিদের দিয়েই নিজ দায়িত্বে এটা আমরা করছি, যাতে পরবর্তীতে কেউ কোনো অভিযোগ বা অপবাদ দিতে না পারে।

প্লাটফর্মের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জেলায় যত সভা-সমাবেশ হচ্ছে, সেগুলোতেও ত্রাণের কোনো অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না বলেও বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন আই সমন্বয়ক। তার কথায়, “কেউ যদি দেখাতে পারে যে, আমরা ত্রাণ তহবিলের কোনো টাকা অন্যকাজে ব্যবহার করছি, তাহলে যা শাস্তি দেয়া হবে, বিনাবাক্যে সেটা মাথা পেতে নেবো।”

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ তাহলে কোথা থেকে আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু করার পর থেকেই সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় আমাদের সহযোগিতা করে আসছেন, এখনও করছেন। তবে কারো কাছ থেকে কোনো অর্থ সহায়তা নেয়া হচ্ছে না। আমরা শুধু সেবাটা নিচ্ছি। এক্ষেত্রে কেউ কেউ তাদের গাড়ি দিয়ে আমাদের পৌঁছে দিচ্ছেন, অনেকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, এভাবেই চলছে।

তবে এখন যেহেতু এটা নিয়েও কথা উঠছে, সেজন্য আগামীতে কারা কী ধরনের সেবা দিয়ে আমাদের সহায়তা করছেন, সেটার তালিকাও আমরা প্রকাশের কথা ভাবা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে ত্রাণ তহবিলের বেশিরভাগ টাকা পরিকল্পিতভাবেই ব্যাংকে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “তহবিল সংগ্রহের শুরুতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে সব খরচ না করে বেশিরভাগই জমা রাখা হবে। কারণ আগের অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জেনেছি যে, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তী ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর অর্থ সহায়তা বেশি প্রয়োজন হয়।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় এখন ওই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে জানিয়েছেন তিনি বলেন, আরও আগে থেকেই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নির্মাণসহ অন্য কাজগুলো করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু আয়-ব্যয়ের অডিট শেষ না হওয়ায় সেটা সম্ভব হচ্ছিলো না।

নিরীক্ষা শেষ করে শিগগিরই তহবিলের সব অর্থ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয় করার পরিকল্পনাও জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার যে তহবিল গঠন করেছে, সেখানেই টাকাগুলো দেয়া হবে। এর ফলে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবেই আমাদের তহবিলের অর্থ মানুষের কাজে আসবে বলে আশা রাখি।”

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension