আন্তর্জাতিকপ্রধান খবর

ইতিহাসে এই প্রথম পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে একটি রাজধানী

পানির গাড়ি আসার শব্দ শুনলেই প্রতিদিন ৪২ বছর বয়সী রাহিলা বালতি আর কনটেইনার নিয়ে ছুটে যান রাস্তায়। কারণ দেরি করলে কিছুই জুটবে না। তিনি বলেন, ‘পানি পাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এটা এখন আমাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন।’

রোববার (২০ জুলাই) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি রাজধানী শহর পুরোপুরি পানি-শূন্য হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। রাহিলা সেই শহরেরই বাসিন্দা। ভয়াবহ এই সংকট তৈরি হয়েছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে। এখানে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় প্রতিটি পরিবারের পানির জন্য সংগ্রাম।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা মার্সি কর্পসের মতে, কাবুল এখন এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যা শুধু পানি নয়—এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানবিকতার জটিল সংকটে।

গত তিন দশকে কাবুলের জনসংখ্যা ২০ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লাখের ঘরে পৌঁছেছে। বাড়তি এই জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে শহরের প্রায় অর্ধেক কূপ ইতিমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। প্রতিবছর কাবুলে ৪ কোটি ৪০ লাখ কিউবিক মিটার বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতি এই শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না।

কাবুলের আহমদ ইয়াসিনের কথাই ধরা যাক। ২৮ বছরের এই যুবক ও তাঁর পরিবার একসময় প্রতিদিন মসজিদের লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতেন। পরে ছয় মাস ধরে খেয়ে না খেয়ে ৪০ হাজার আফগানি ব্যয় করে নিজের বাড়িতেই ১২০ মিটার গভীর কূপ খনন করেন। তবে ওই পানিও নিরাপদ নয়। ইয়াসিন বলেন, ‘আমরা সেটা ফুটিয়ে ঠান্ডা করে তবেই খাই।’

মার্সি কর্পসের তথ্যমতে, কাবুলের ৮০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত। এর কারণ অপ্রশিক্ষিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও শিল্পবর্জ্য। ফলে ডায়রিয়া, বমির মতো রোগ সেখানে ছড়িয়ে পড়ছে।

পানির সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন নারী ও শিশুরা। অনেক নারীকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে পানি আনতে হয়। তাও আবার তালেবানের বিধিনিষেধের মধ্যে একজন পুরুষ অভিভাবক ছাড়া তাঁদের বাইরে যাওয়াও নিষিদ্ধ। এক তরুণী বলেন, ‘একজন মেয়ের একা রাস্তায় পানি আনতে যাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। পথে হেনস্তা হওয়া এখন সাধারণ বিষয়।’

শিশুরাও এখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে পানি আনতে যায়। ভারী বালতি টেনে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। এই প্রবণতা দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বৃত্তকে আরও গভীর করে তুলছে।

ভয়াবহ এই সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন খাতে দরকার যেখানে ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার প্রয়োজন, সেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮০ লাখ ডলার তহবিল এসেছে।

রাহিলা বলেন, ‘যখন এখানে এসেছিলাম, জীবন ছিল সহজ। এখন আর টিকে থাকার উপায় নেই। আবার কোথাও গিয়ে বাসা বাঁধতে হবে। কিন্তু কোথায় যাব?’

এই পানি সংকট কাবুলের একটি ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত—যেখানে উন্নয়ন, সহানুভূতি এবং টেকসই নীতি ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension