যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বেড়াজালে আটকা ট্রাম্প

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট সামরিক বা কূটনৈতিক সাফল্য নেই। ফলে এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকির মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বের জন্য আরো বড় ধরনের সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এমন তথ্য উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে।

অচল যুদ্ধবিরতির বাড়তি চাপ

সেখানে বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী দাবি করলেও বাস্তবে সমাধানের কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। ইরান নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তা দ্রুত প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প।

ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়বে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। যা দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

এ ছাড়া এর রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে।

আর দীর্ঘস্থায়ী সংকট তার ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে ইরান সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে তা শুধু দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়, বরং ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের অপূর্ণ লক্ষ্য

চলমান যুদ্ধে ব্যয় ও ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আরো বড় একটি সমস্যা সামনে এসেছে। যুদ্ধ শুরু করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঘোষিত অনেক লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। তবুও শাসন পরিবর্তন থেকে শুরু করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা—ট্রাম্পের এসব মূল লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

এক সুতায় বাঁধা যুদ্ধবিরতি

গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য নির্ধারিত সফর বাতিল এবং ইরানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যত স্থগিত থাকা যুদ্ধবিরতি পুনরায় চালুর সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।

তেহরান প্রস্তাব দিয়েছিল, সংঘাত শেষ হওয়ার পর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হবে। কিন্তু ট্রাম্প শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের দাবি জানিয়ে এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন।

সম্প্রতি শান্তি আলোচনা নিয়ে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও ট্রাম্প সন্তুষ্ট নন বলে জানান। গত শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। যার ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম কিছুটা কমে।

ব্যর্থতার গ্লানি ট্রাম্পের

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত শেষে যদি ইরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য বড় ধাক্কা হবে।

ওয়াশিংটনের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ‘এতে তাকে এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখা হবে, যিনি বিশ্বকে আরো অনিরাপদ করে তুলেছিলেন।’

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেন, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ইরান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্পের হাতেই সব সুবিধা রয়েছে। সেরা চুক্তি করতে ট্রাম্পের কাছে পর্যাপ্ত সময়ও আছে।

যুদ্ধ আবার শুরু?

ইরান সংকটে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে সামরিক ও কৌশলগত বিকল্প বিবেচনা করছে। কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নৌ-অবরোধ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশটির তেল রপ্তানি আরো সীমিত করা এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে বাধ্য করার লক্ষ্যে এই অবরোধ কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

একই সঙ্গে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার পথও খোলা রাখা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড স্বল্প সময়ের মধ্যে শক্তিশালী হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি রেখেছে। পাশাপাশি হরমুজের একটি অংশ দখল করে পুনরায় জাহাজ চলাচল চালু করার বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।

এ বিষয়ে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা মনে করছেন, বর্তমান অচলাবস্থা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাদের মতে, এই সংকটের দ্রুত সমাধান দেখা কঠিন।

অন্যদিকে, ইরান এখনো দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়ে দেশটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হতো।

মূল লক্ষ্যই অমীমাংসিত

যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো। কিন্তু উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এখনো রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য—দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির পথ বন্ধ করা। যা এখনো অর্জন করতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গত জুনের বিমান হামলার পরও ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় মজুদ ভূগর্ভে রয়ে গেছে। এই মজুদ পুনরুদ্ধার করে ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে।

ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার চায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সেটি স্বীকৃতি দিতে হবে।

তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেছেন, ট্রাম্প সামরিক দিক থেকে সব লক্ষ্য অর্জন বা অতিক্রম করেছেন। আর ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকার না দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

হিমায়িত সংঘাত

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি একটি ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট বা হিমায়িত সংঘাতে’ পরিণত হতে পারে। যেখানে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে পারে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। কারণ যুদ্ধের আগে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হয়নি।

অভ্যন্তরীণ চাপ

দেশের ভেতরেও ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। একটি জরিপে দেখা যায়, তার জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জন-অসন্তোষও বাড়ছে।

এ অবস্থায় ইরান সময়ক্ষেপণ কৌশল নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম।

ফলে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension