আন্তর্জাতিক

নতুন ‘ফাইবার অপটিক’ ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে হিজবুল্লাহ, দিশাহারা ইসরায়েল

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের তাইবেহ এলাকার আকাশে সম্প্রতি নতুন এক ধরনের ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের বহু বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলি দৈনিক ইয়েদিয়োথ আহরোনোথ (ইয়নেট)-এর প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি সাধারণ তারের কাছে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এমনকি একটি মেডিকেল ইভাকুয়েশন হেলিকপ্টার পর্যন্ত এই নতুন ধরনের ড্রোন হামলার মুখে অসহায় হয়ে পড়ে।

আহত ইসরায়েলি সেনাদের উদ্ধার করতে আসা মেডিকেল ইভাকুয়েশন হেলিকপ্টারের দিকে হঠাৎ একটি ড্রোন দ্রুত এগিয়ে আসে। এ সময় দেশটির সব ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে সেনারা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ে ড্রোনটি কয়েক মিটার দূরে বিস্ফোরিত করতে সক্ষম হন।

নতুন হুমকি: ফাইবার অপটিক নিয়ন্ত্রিত ড্রোন

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুদ্ধক্ষেত্রে যে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করেছে, তা হলো এক ধরণের ফার্স্ট পারসন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন। এগুলো রেডিও সিগন্যাল বা স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি অপারেটরের সঙ্গে ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে সংযুক্ত থাকে।

ফলে প্রচলিত ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থা এগুলোকে থামাতে পারে না।
এই ড্রোনগুলোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো খুবই হালকা ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি, ফলে রাডার বা তাপ-সংবেদী সেন্সরে প্রায় অদৃশ্য থাকে। আর এই কেবল ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ফলে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে খুব কাছাকাছি এসে আঘাত হানতে পারে।

প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ট্যাংক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘ট্রফি’ শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। তবে এসব ড্রোনের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না। কারণ, এই ড্রোনগুলো প্রচলিত অস্ত্রের মতো গতিপথ বা সিগন্যাল তৈরি করে না।

ফলে সামনের সারির সেনাদের কাছে প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে, চোখে দেখা গেলে গুলি করা। যা একটি উচ্চপ্রযুক্তির সেনাবাহিনীর জন্য স্পষ্টতই অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া : ‘নেট প্রতিরক্ষা’

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি সেনারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু উদ্ভাবনী কিন্তু অস্থায়ী সমাধান নিয়েছে। সামরিক অবস্থান, ঘরবাড়ি বা জানালার ওপর জাল টানিয়ে রাখা হচ্ছে যাতে ড্রোন আটকে যায়। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং এক ধরনের প্রতিরোধমূলক ‘বাঁচার চেষ্টা’।

এই কৌশল নতুন নয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তীব্র ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মধ্যে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ফাইবার অপটিক ড্রোন ব্যবহার করছে। সেই অভিজ্ঞতাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে।

কম খরচে উচ্চ কার্যকারিতা

এই ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা, কিন্তু অত্যন্ত নির্ভুল। অপারেটররা লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে যেমন টারেট বা ট্র্যাকের মতো ট্যাংকের দুর্বল অংশে টার্গেট করতে পারে। ফলে এটি প্রচলিত অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের সস্তা বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।

তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ভারি বৃষ্টি বা প্রবল বাতাসের মতো খারাপ আবহাওয়া ড্রোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া গাছ বা বাধার সঙ্গে জড়িয়ে ফাইবার অপটিক কেবল সহজেই ছিঁড়ে গিয়ে ড্রোনটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।

তবে কম খরচের এমন প্রযুক্তির ব্যবহার উচ্চমূল্যের সামরিক ব্যাবস্থাকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে তা বিশ্লেষকদের অবাক করে দিয়েছে। শক্তিশালী রাডার থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগাম শনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension