বাংলাদেশ

১৬ কোটি টাকায় যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন ভিসা নিয়েছেন বরিশালের সাবেক মেয়র খোকন

প্রায় ১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন ভিসা নিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) সাবেক মেয়র ও শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই সেরনিয়াবাত খোকন আব্দুল্লাহ—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অভিযোগ রয়েছে, গণ-আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়ার আগে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ব্যবসায় বিনিয়োগ করে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এদিকে, পালিয়ে থাকার সময় ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার ব্যাকডেটের চেকে সই এবং কমিশন নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো-খুলনায় পালিয়ে থাকা অবস্থায় বিসিসির বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের পাওনা প্রায় ২৭ কোটি টাকার চেকে ব্যাক ডেটে সই করেন খোকন। বরিশাল থেকে চেক খুলনায় নিয়ে সই করিয়ে আবার বরিশালে আনার কাজটি করেন খোকনের তৎকালীন এপিএস রুবেল। তাকে সহায়তা করেন বিসিসির প্রকৌশল (সিভিল) ও হিসাব শাখার দুই কর্মকর্তা। তাদের একজন বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদের নেতা। আর চেক সই করার বিনিময়ে মোট বিলের শতকরা ২০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট টাকা নেন শেখ মুজিবের ভগিনীপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পুত্র সাবেক এই মেয়র। টাকা হাতে পাওয়ার পর চেকে সই করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কেবল শেখ পরিবারের কোটায় লোকদেখানো নির্বাচন করে মেয়র বানানো হয় খোকনকে। মাত্র ৭ মাসের দায়িত্ব পালনকালে নানাভাবে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করছে দুদক। ৪ আগস্ট সকালে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে গুলি ছুড়তে গিয়ে গণপিটুনিতে মারা যান বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা টুটুল চৌধুরী। ওই ঘটনায় ভীত হয়ে পড়েন খোকন। রাতে তার আলেকান্দা সড়কের ভাড়া বাসায় ডেকে নেন আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগের দুই নেতাকে। তখনই বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ওই রাতে খোকনের বাসায় থাকা ওই ৩ নেতার একজন জানান, ‘একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হলেও যাওয়ার সময় কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ চলে যান খোকন। রাত ৩টা নাগাদ বিশেষ একটি বাহিনীর দুটি গাড়ি সামনে পেছনে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায় সাবেক এই মেয়র ও তার স্ত্রীকে বহনকারী গাড়ি। তার বেড়িয়ে যাওয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা পর আমরা জানতে পারি যে তিনি চলে গেছেন। বরিশাল থেকে সোজা খুলনায় গিয়ে ওঠেন সোনাডাঙ্গা এলাকায় শ্যালক মিঠুর বাড়িতে। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর আশ্রয় নেন খুলনা বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার বাসায়। আওয়ামী শাসনামলের দীর্ঘ সময় ওই নেতাকে মোংলা বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়তা করেছিলেন খোকন। তিনি নিজেও ছিলেন মোংলা বন্দর স্টিভেডর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করতেন সমুদ্রগামী জাহাজে। রাতের বাকিটা সময় আমরা ওই বাসায় থেকে খুব ভোরে চলে আসি।’

৪ আগস্ট রাত ১২টায় বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন খোকন আব্দুল্লাহ। ৩ ঘণ্টা চলে প্রস্তুতি। ওই রাতে তার বাসায় থাকা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘এই ৩ ঘণ্টায় ঘরে থাকা নগদ টাকা আর স্বর্ণালংকার ব্যাগে ভরেন তিনি। তাকে সহায়তা করা তৎকালীন এপিএস রুবেলের কাছে পরে শুনেছি যে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ছিল সেখানে। তবে কোনো কাপড়চোপড় সঙ্গে নেননি তিনি বা তার স্ত্রী। বিপুল অঙ্কের ওই টাকা নিয়েই তারা ওঠেন খুলনায় শ্যালক মিঠুর বাসায়। সেখান থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় ৫ আগস্টের পর মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়া এক যুবলীগ নেতার কাছে। মালয়েশিয়া থেকে পরে তা পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে মেয়র খোকনের পুত্র প্রত্যুষের নামে থাকা একাধিক নামসর্বস্ব কোম্পানির হিসাবে। প্রত্যুষ আগে থেকেই মার্কিন নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রে টাকা নিতে হলে যেহেতু অর্থের উৎস জানাতে হয়, তাই সিঙ্গাপুরে খোলা নামসর্বস্ব কোম্পানির মাধ্যমে সেখানে টাকা পাঠাতেন খোকন। মেয়র হওয়ার পর থেকে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত যত টাকা হাতিয়েছেন, তার সিংহভাগ এভাবেই পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য করে আয় করা অর্থও পাচার হয়েছে সেখানে। তবে শেষ চালানের ১৬ কোটি টাকা পাঠাতে গিয়ে ৩ কোটি খোয়ান তিনি। মালয়েশিয়ায় যার কাছে হুন্ডি করে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠানো হয়, সিঙ্গাপুরে পাঠানোর ক্ষেত্রে সেখান থেকে ৩ কোটি টাকা মেরে দেন তিনি। এ নিয়ে ওই ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়াও হয় খোকনের।’

খুলনায় বিএনপি নেতার আশ্রয়ে থেকে চলে তার দেশছাড়ার চেষ্টা। প্রথমে চারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সবশেষ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ঢোকেন ভারতের আসামে। গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে বিমানে পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতার নিউ টাউন অ্যাকশন অ্যারিয়া-১-এর কাছে ভাড়া নেওয়া বাসায় ওঠেন স্ত্রীকে নিয়ে।

কলকাতায় অবস্থানরত বরিশালের এক আ.লীগ নেতা বলেন, ‘এখানে ১ মাসের জন্য একটি গাড়ি ভাড়া নেন খোকন। গাড়ি ও ড্রাইভার তার বাসাতেই থাকত। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর এই দম্পতিকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দেখা গেছে কলকাতার এক্সেস মলে। কলকাতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে থাকা ছেলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন খোকন। ছেলে প্রত্যুষ যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেন হওয়ায় খুব একটা কষ্ট হয়নি তাদের। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতা থেকে উড়োজাহাজে যুক্তরাষ্ট্র যান খোকন।’

বর্তমানে টেক্সাসে অবস্থানরত বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘ট্রাম্প সরকারের সর্বশেষ গোল্ডেন ভিসা সুযোগের আওতায় খোকন ও তার স্ত্রী প্রায় ১৬ কোটি টাকায় নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা। সেই সুযোগেই টেক্সাসে আছেন তারা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কিনেছেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ একটি পেট্রোল পাম্প। এসব বিনিয়োগ আর ব্যবসা-বাণিজ্য দেখিয়ে চলছে সেখানে তাদের দুজনের নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টা। টেক্সাসে প্রত্যুষ সেরনিয়াবাতের নামে আগে থেকেই কেনা ছিল ২টি বাড়ি। তার একটিতে থাকছেন খোকন ও লুনা।’

কলকাতায় অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘খোকন আব্দুল্লাহ মেয়র হয়েছিলেন কেবল টাকা কামাইয়ের জন্য। দায়িত্ব পালনের ৭ মাস তিনি সেটাই করেছেন। হাতিয়ে নিয়েছেন শতকোটি টাকা। সেই টাকায় এখন আয়েশ করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আর আমরা খেয়ে-না-খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য খোকন আব্দুল্লাহর প্রচলিত সবকটি নম্বরে কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়। দলের কারও সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তার একসময়কার ঘনিষ্ঠরা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension