
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস
নিহত অন্তত ১৬৫, নিখোঁজ এক হাজারের বেশি; চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান
হোসনেআরা চৌধুরী :
নেপাল-চীন সীমান্তের পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। প্রবল পানির স্রোত, কাদা, পাথর ও বরফের ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন জনপদ, সড়ক, সেতু ও স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সর্বশেষ তথ্যে নেপালে অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।
নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বহু বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, সড়ক ও সেতু পানির স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে।
হিমবাহ ধস থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে এই বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হলেও পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি হিমবাহের বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ধসে নদীর গতিপথে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে। সেই ধ্বংসাবশেষের স্রোত দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রবণতা এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও
দুর্যোগকবলিত অঞ্চলটি তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারতের কৈলাস-মানসসরোবরগামী তীর্থযাত্রী ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তিব্বতের গিরং এলাকায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ সেখানে কয়েক শ’ মানুষ নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে।
উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী
দুর্গত এলাকায় নেপালের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানে নদী ও ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
তবে বিধ্বস্ত সড়ক ও সেতু, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং প্রবল পানির স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছাতেও সময় লাগছে।
আরও প্রাণহানির আশঙ্কা
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ ও নদীর স্রোতের কারণে এখনো অনেক এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের কাছ থেকেও উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং আকস্মিক বন্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে নিখোঁজদের সন্ধান, জীবিতদের উদ্ধার এবং দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই নেপাল সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।



