
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ৭ দিনের রোডম্যাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ওয়াশিংটনকে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ দিয়েছে ইরান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের এ পরিকল্পনার কথা জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এরই মধ্যে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিংটন নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ফের শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-গাজা ও লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সাত দিনের মধ্যে সামরিক সংঘাত বন্ধ করা, ইরানের জব্দ থাকা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ ছাড় করা, ইরানি তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।
ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাত দিনের শেষ দিনেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। এরপর দুই দেশ পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় বসবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যুদ্ধের মধ্যে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রণালিটি পুনরায় সচল করা এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এর আগে জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল। এতে যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত কমানো, ইরানি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালিতে যোগাযোগের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সংঘাত ও মতপার্থক্যের কারণে সেই উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে যায়।
নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরান মূলত জুনের ওই সমঝোতার কিছু শর্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছে। আরাকচি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিকল্পনাটি জমা দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন শর্তগুলো মেনে নিলে তেহরানও পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে—এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিকল্প খোলা রাখার কথা জানিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রস্তাবটি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলেও মৌলিক মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা। তেহরান জুনের সমঝোতার ভিত্তিতে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি খুলতে চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান ও আলোচনার শর্ত নিয়ে এখনো বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগটি আরও জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। তবে আরাকচির বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোকে তেহরান ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা ইরানের স্বার্থ ও পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই হতে হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা



