
পোস্টারে মুক্তিযুদ্ধ
আনিসুজ্জামান মুহাম্মদ

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মনে শক্তি জোগাতে, ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানাতে ছাপানো হয়েছিল এমন কিছু পোস্টার। এ পোস্টারে লেখা ছিল- বাংলার বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি। যুগ যুগ ধরেই, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত গাঙ্গেয় এ ব-দ্বীপ, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সাম্প্রাদিয়ক সম্প্রীতির অনন্য এক উদাহরণ। ৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোতেও, ব্যতয় ঘটেনি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধর্মের মানুষ।

লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে, অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। যুদ্ধ ময়দানে, এদেশের নারীদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য।এই পোস্টারগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল বাংলার স্বাধীনতার জন্যে বাংলাদেশের মায়েরা মেয়েরা সবাই যুদ্ধ করছে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এই পোস্টার।

সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী। এই পোস্টারটি প্রমাণ করে বাংলার বাংলার স্বাধীনতা অর্জনে বাংলার দামাল ছেলেরা প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে সদাপ্রস্তুত। দিন-রাত, সকাল-সন্ধ্যা, শীত-গ্রীষ্ম-প্রকৃতির বৈরীতা কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে, বুকের রক্ত বিলিয়ে স্বাধীনতা এনেছে যারা, তাদের দৃঢ়, সংকল্প অনমনীয়তা ফুটে উঠেছে। এই তিনটি পোস্টারের শিল্পী প্রাণেশ কুমার মণ্ডল।

বাংলাদেশের স্বনামধন্য পটুয়া শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা এই পোস্টারটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলার মানুষদের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়ার জল্লাদ রূপই এই পোস্টারটিতে ফুটে উঠেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলিলের সঙ্গে এই পোস্টারটিও হয়ে উঠেছে এক মূল্যবান দলিল।
এমনি করেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোয় শিল্পীরা তাঁদের হাতের তুলিতে ফুটিয়ে তুললেন প্রতিবাদ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ইমদাদ হোসেনের আঁকা বেশকিছু পোস্টার জনপ্রিয় হয়েছিল। সত্তরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শীর্ষক একটি পোস্টার সাড়া জাগিয়েছিল। ষাটের দশকের শুরুতে এক রঙের অফসেট মেশিনে পোস্টার ছাপা হয়।সেসময় যে প্রেসগুলো পোস্টার ছাপানোর কাজ করত সেগুলো হল- পাকিস্তান কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রেস, রিগ্যাল প্রেস, আর্টপ্রেস। সত্তর সালের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারে নি। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নৃশংসভাবে গণহত্যাযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ বাঙালিদের ওপর। শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ।

রঙ আর তুলির আঁচড়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ভেতরে স্বাধীনতার আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সে সময়কার শিল্পীরা।
যেমন শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসানের, ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’, কিংবা নিতুন কুন্ডুর ‘সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’ পোস্টারগুলো অন্যরকম এক শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল মুক্তিপাগল বাংলার মানুষকে।
সাত মার্চে যার অগ্নিঝরা ভাষণে উথাল-পাথাল হয়ে ওঠেছিল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, বাঙালির সেই নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে এ পোস্টার।
পোস্টারের ছবি ‘জম্নযুদ্ধ ৭১’-এর সৌজন্যে।



