
নারী-পুরুষ সবার জন্যই রাইডার শাহনাজ- ‘মানুষের হাসি দেখলে তো আমার সংসার চলবে না’
সমাজে এত পেশা থাকতে জীবিকা হিসেবে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বেছে নিয়েছেন রাজধানীর মিরপুর সাড়ে ১১ নিবাসী শাহনাজ আক্তার পুতুল। রাতেও অনায়সে যাত্রী পরিবহন করেন জীবন সংগ্রামী এই নারী।
প্রায় ২ মাস ধরে স্মার্টফোনের অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মোটরবাইক চালাচ্ছেন শাহনাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফেসবুকের কল্যাণে তিনি এরই মধ্যে অনেকটাই পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
১১ জানুয়ারি অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট রাফিউজ্জামান শাহনাজকে নিয়ে লিখেছেন, ‘উবারে কল দিলাম, ওপাশে রাইডার ফোন ধরে প্রথমেই বললেন, ভাইয়া আমি মহিলা ড্রাইভার, আমার বাইকে চড়তে আপনার আপত্তি নাই তো?’ আপত্তি নেই শুনে শাহনাজ বলেন, ‘আমি আসছি ভাইয়া’। রাফিউজ্জামান তাঁর ফেসবুকের টাইমলাইনে শাহনাজ আক্তারের সংগ্রামের অনেকটুকুই লিখেছেন। তাঁর এই পোস্ট ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে গেছে ফেসবুকে।
শাহনাজ হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওই ভাইয়ের পোস্ট দেওয়ার পর থেকে রাস্তায় বের হলে অনেকেই বলে, আপনি শাহনাজ আপা না?’
শাহনাজ জানালেন, সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। রাজধানীর মিরপুরেই জন্ম শাহনাজের। তিনি জানালেন বাবা নেই, মা আর বোনেরা আছেন। কৈশোরে মিরপুরের এক ছেলেকে দেখে ভারতের নায়ক ‘শাররুখ খান’–এর মতো লাগত তাঁর। পরিবারের অমতে শুধু চেহারা দেখে সেই শাররুখকেই বিয়ে করেন ২০০০ সালে। কিন্তু দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি, ছাড়াছাড়িও হয়নি। এ নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চান না। দুই মেয়েকে নিয়ে মা–বোনদের সহায়তায় দিন যাচ্ছিল তাঁর। এক মেয়ে নবম ও এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন জীবনসংগ্রামে।
শাহনাজ জানালেন, মোটরবাইকটি তিনি তাঁর স্বামীর জন্যই কিনেছিলেন। তবে স্বামী বাইক চালিয়ে আয় করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। শাহনাজ ছোটবেলা থেকেই সাইকেল চালাতেন, নিজের চেষ্টাতেই মোটরবাইকও চালাতে শিখে যান। এলাকার চেনাজানা অনেকেই উবার, পাঠাও চালাচ্ছেন দেখে নিজেই নেমে যান এ পেশায়। ‘ওভাই’ নামের আরেক রাইডেও চাকরি করেন কয়েক মাস। তবে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত শুধু নারীযাত্রীরা কল দিলেই তিনি ট্রিপ দিতে পারতেন। তবে কোম্পানি থেকে যে টার্গেট দেওয়া হতো, তা প্রায় সময়ই পূরণ করা সম্ভব হতো না। তারপর উবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
শাহনাজ জানালেন, সকালবেলাটা মোটরবাইক নিয়ে বের হতে পারেন না। দুই মেয়েকে স্কুলে নেওয়া, খাবার তৈরিসহ বিভিন্ন কাজ সেরে মায়ের বাসায় মেয়েদের রেখে কাজে বের হতে হতে দুইটা–তিনটা বেজে যায়। তবে প্রতিদিনই সব খরচ বাদে পাঁচ থেকে ছয় শ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। এ টাকা দিয়ে দুই মেয়ের মুখে ভালোমন্দ খাবার তুলে দিতে পারছেন, তবে ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘরভাড়া, দুই মেয়ের পড়াশোনা, খাবার সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। তাই শাহনাজ একটি স্থায়ী চাকরি করতে চান। তবে সে ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি।
পথের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহনাজ বলেন, প্রতিদিন এই অনেক অভিজ্ঞতা হয়, আগে মন খারাপ হতো, ভাবতাম, ছেড়ে দিবো। ‘পথে কেউ হাসেন, কেউ কানাকানি করেন আবার কেউ স্যালুটও দেন। আবার নারী চালক শুনেই অনেকে রাইড বাতিল করে দেন।’ তবে ট্রাফিক পুলিশদের কাছ থেকে বেশি সহায়তা পান বলে জানালেন শাহনাজ।
‘রাস্তায় যখন মোটরবাইক নিয়ে বের হই, পেছনে পুরুষ যাত্রী থাকে, তখন মানুষ হাসে। কিন্তু মানুষের হাসি দেখলে তো আর আমার সংসার চলবে না।’ মেয়েরা চাইলে পাঁচ মিনিটে হাজার টাকা কামাই করতে পারে, কিন্তু আমি ঐ লাইনে যাবো না, আমি সম্মানের সাথে রোজগার করি। আমাকে তো রোজগার করতে হবে, আমার দুইটা মেয়ে, মেয়েদেরকে আমাকেই পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করতে হবে!
আর উবারের যাত্রীরা শিক্ষিত–ভদ্র হওয়ায় এখন পর্যন্ত বাজে কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি বলেও জানালেন। দুই মেয়ের কাছ থেকেও উৎসাহ পান এ কাজের জন্য।




