
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের পথে
জাহান আরা দোলন: আজ ৩ ডিসেম্বর। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে সমগ্র বাংলা উত্তাল হয়ে ছিল মুক্তির সংগ্রামে। পুরো একাত্তরের মতো ডিসেম্বরের প্রতিটি দিনও ছিল ঘটনাবহুল। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও বাঙালির স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্যোদয়ের ভিত্তি সূচিত হয়েছিল বেশ আগেই।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সমগ্র বাংলা উত্তাল হয়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। অপ্রতিরোধ্য বাঙালির বিজয়ের পথে পিছু হটতে থাকে হানাদার বাহিনী।
মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি গেরিলা আক্রমণ এবং সম্মুখ যুদ্ধে পাকবাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ে। পদে পদে আক্রমণে পাক বাহিনীকে পরাস্ত করে এগিয়ে যেতে থাকে মুক্তি বাহিনী। বাঙালি একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে পাক হানাদার বাহিনী বিপাকে পড়ে।
পশ্চিম সীমান্তের আকাশ ও স্থলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আকারে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনী গঠিত হয়। তারা যৌথভাবে সীমান্ত এলাকায় অপারেশন শুরু করে। ভারতীয় বাহিনী মোট সাতটি পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
ভারতীয় বাহিনীর নবম ডিভিশন গভীর রাতে গরীবপুর-জগন্নাথপুর হয়ে যশোর ঢাকা মহাসড়কে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। চতুর্থ এবং ষষ্ঠ ডিভিশনও বেশ কয়েকটি রুট ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে, যশোর কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, জেলার আরও কয়েকটি থানা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। চতুর্থ এবং দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ফেনী থেকে অগ্রসর হয়ে রেজুমিয়া ব্রিজে পৌঁছে। এক নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক তার বাহিনী নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। যৌথ বাহিনী চট্টগ্রামের মুহুরি নদী ও ফেনী-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে অগ্রসর হয়।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরন সিং দিল্লির সংসদ অধিবেশনে বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের অত্যাচার বন্ধের জন্য ভারত যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনও লাভ হচ্ছে না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতে আশ্রয় নিতে আসা বাংলাদেশি শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ করতে দিচ্ছে না। পাকিস্তানিরা সীমান্ত এলাকায় ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকি দিচ্ছে।
আমেরিকান সিনেটর উইলিয়াম স্যাক্সবি রাওয়ালপিন্ডিতে সাংবাদিকদের জানান, তিনি অনেকবার চেষ্টা করার পরও শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে পারেন নি।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতা সফরকালে পাকিস্তান ভারতের ওপর সরাসরি হামলা চালায়। প্রধানমন্ত্রী তার সফর সংক্ষিপ্ত করে দিল্লি ফিরে আসেন। বেতারে জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে তিনি বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল আক্রমণের দায় পাকিস্তানের। যুদ্ধ মোকাবিলায় দেশকে তৈরি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
এদিন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস এর সকল ফ্লাইট বাতিল করা হয়। সামরিক জান্তা ঢাকায় কারফিউ ও ব্ল্যাকআউট জারি করে। শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ লড়াই। জলে, স্থলে, আকাশে। শুরু হয় চারদিক থেকে এবং ভেতরের মুক্ত এলাকা থেকে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ। আক্রমণের প্রথমেই উপকূলবর্তী বন্দরগুলো অবরোধ করে হানাদার বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করা হয় এবং পাক সাবমেরিন গাজীকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।❐



