
মুখে স্কচটেপ পেঁচিয়ে সুপারগ্লু দিয়ে দু হাত জোড়া দিয়ে গৃহকর্মী নির্যাতন
রাজধানী বনানী থানা এলাকার একটি বাড়িতে গৃহকর্মী তানিয়া বেগমকে সুপার গ্লু ও মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় এখনো থানায় কোনো মামলা হয়নি।
পুলিশ বলছে, তানিয়ার পরিবারকে বারবার অনুরোধ করার পরও তারা কেউ মামলা করতে আসেনি। তাই তার পরিবার না করলেও পুলিশ বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করবে।
আজ শুক্রবার বনানী থানার ওসি নুরে আযম মিয়া কালবেলাকে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘তানিয়ার পরিবারের কেউ এখনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ করতে আসেননি। তাই তারা কেউ না এলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে ৯৯৯-এ কলের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, বনানীর ২৩ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির সাততলার ফ্ল্যাটে একজনকে নির্যাতন করা হচ্ছে। বাইরে থেকে তার চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে ফ্ল্যাটে গিয়ে হাতে সুপার গ্লু ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ভুক্তভোগী গৃহকর্মী তানিয়া বেগমকে উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ।
তানিয়াকে উদ্ধারের পর গৃহকর্ত্রী সামিনা আলমকে আটক করে নেওয়া হয় বনানী থানায়। তবে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ কিংবা তাৎক্ষণিক এ ঘটনার কোনও আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী গৃহকর্মীর পক্ষ থেকে কোনও মামলা করতে রাজি না হওয়ায় গৃহকর্ত্রী সামিনা আলমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তানিয়া বেগমের ভাই শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তার বোনকে যারা নির্যাতন করেছে তারা প্রভাবশালী, মামলা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন। এ ছাড়া মামলার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। এ কারণে মামলা করা হয়নি। তিনি আরও জানান, দুই বছর আগেও ওই বাসায় কাজ করেছিলেন তানিয়া। পরে কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চলে যান। এরপর দুই মাস আগে বাড়ি থেকে রাগ করে ঢাকায় এসে সামিনার বাসায় আবারও কাজে যোগ দেন। তানিয়া এখন চিকিৎসাধীন। চিকিৎসা শেষে তাকে তারা গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।
নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী তানিয়ার বড় বোন নাসিমা বেগম জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দায়। কয়েক বছর ধরেই ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ঢাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন গুলশানের কালাচাঁদপুরে। ছোট বোন তানিয়া গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পড়ত। মাঝেমাঝে ঢাকায় নাসিমার বাসায় বেড়াতে আসত। মাসখানেক আগে অভিমান করে গ্রামের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় তানিয়া। খোঁজাখুঁজির পর তার সন্ধান মিলছিল না। এরই মধ্যে এক দিন তানিয়া তার মাকে ফোন করে জানায়, ‘চাকরি পেয়েছে। তাকে নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা না করতে।’ তখন তার মা বলেছিলেন চাকরি বাদ দিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরতে। তবে কোন এলাকায় তার বসবাস, সেটা জানায়নি তানিয়া।
নাসিমা আরও জানান, বোনের খোঁজ পেতে মা-বাবা পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিলেন। ফোনও ধরছিল না তানিয়া। উপায়ান্তর না দেখে পাঁচ দিন আগে তানিয়ার মোবাইল নম্বরে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান নাসিমা। সেখানে তিনি বলেন, ‘বাবা খুব অসুস্থ। তাঁকে দেখতে সবাই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে।’ ওই মেসেজ পাঠানোর পর তানিয়ার নম্বরে ফোন করলে অপরিচিত একজন নারী ধরে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেন। এর পর বোনকে উদ্ধারে ১৭ এপ্রিল তাঁরা গুলশান থানায় একটি জিডি করেন। এরই মধ্যে বনানী থেকে অপরিচিত এক ব্যক্তি তানিয়ার বাবাকে ফোন করে জানান, বনানীর একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তিনি। একটি চিরকুট তিনি পেয়েছেন। সেখানে ওই নম্বরটি দেওয়া ছিল। মেয়েটি তাকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছে। নইলে তাকে মেরে ফেলা হবে বলেও চিরকুটে উল্লেখ ছিল।
নাসিমা জানান, বোনকে উদ্ধারের পর চেহারা চেনা যাচ্ছিল না। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন। কখনও নির্যাতনের শিকার হয়ে অচেতন হয়ে পড়ত সে। জোর করে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হতো। ইয়াবা আর আইস এমন শব্দ তার বোন ওই ফ্ল্যাটে শুনতে পেত। নির্যাতন করে মোবাইলে ছবি তুলে রাখতেন ওই গৃহকর্ত্রী। এও বলতেন, চুল কেটে ফেলে তানিয়াকে সাততলা থেকে ফেলে দিলেও লোকজন ভাববে, তার মস্তিস্ক বিকৃত হয়েছিল। মারধর করার সময় চিৎকার করলে তালুতে সুপারগ্লু মেখে দুই হাত একসঙ্গে করে দিত। মুখ স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হতো। তানিয়ার মোবাইলেও কিছু ছবি রয়েছে, যা দেখলে গা শিউরে ওঠে। বোনের মান-ইজ্জতের কথা চিন্তা করে মামলা করিনি। থানায় নেওয়ার পর ওই নারীর ব্যবসায়ী স্বামী বারবার মাফ চাচ্ছিলেন। এ ঘটনা নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই- এটা পুলিশের কাছে দিয়েছি। দু’পক্ষ মিটমাট হয়েছে। গরিব মানুষ; মামলা করলে চালাব কীভাবে? খাওয়ার টাকা জোগাড়ের চিন্তা করতেই দিন পার হয়। এখনও বোনের চিকিৎসা চলছে। বাসায় আনার পর তানিয়ার মোবাইলে একটি মেসেজ পাঠান নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত ওই নারী। তিনি বলেন, ‘তোকে ১ লাখ টাকা দিয়েছি। সেটা তো পেয়েছিস।’ নাসিমা জানান, পুলিশ তাদের ৫৭ হাজার টাকা দিয়েছে।
এ ঘটনার ব্যাপারে জানতে নির্যাতনের শিকার কিশোরীর ভাই মো. শফিকুরের সঙ্গে দুই দফা কথা হয়। তিনি বলেন, ‘পুলিশ শুরু থেকে বলছিল, ওরা বড়লোক। মামলা করে কী পাবেন? বরং সমঝোতা করে ফেলেন।’ এর পরই শফিকুর তাঁর কথা ঘুরিয়ে বলেন, ‘আমরাই মামলা করতে চাইনি। মামলা করলেও শেষ পর্যন্ত চালাতে পারব না।’
এ ব্যাপারে বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া বলেন, ‘যেভাবে মেয়েটির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, সেটা বর্ণনা করাও কঠিন। মামলা করার জন্য অনেক বোঝানো হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর পরিবার কোনোভাবে রাজি হচ্ছিল না। পরিচিত কারও ফোন পেয়ে তারা মামলা করা থেকে সরে গেছে। এ ঘটনার বিচার করা যাচ্ছে না- এটা ভেবে আমাদের খারাপ লাগছে। তারা না চাইলে পুলিশ তো অতিউৎসাহী হয়ে মামলা নিতে পারে না।’
মামলা না করার জন্য ভুক্তভোগীর স্বজনকে পুলিশের পক্ষ থেকে বোঝানো হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, পুলিশ কেন মামলা না করতে বোঝাতে যাবে? চাপ, প্রলোভন ও টাকা দিয়ে ভয়ংকর এ ঘটনা আড়াল করার অভিযোগের ব্যাপারে ওসির ভাষ্য, ‘টাকা-পয়সা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না।’
৯৯৯-এ কল পেয়ে বনানীর ওই ফ্ল্যাটে যান বনানী থানার উপপরিদর্শক এজাজুল হক। তিনি বলেন, ওই গৃহকর্ত্রীর ছোট্ট এক সন্তান রয়েছে। কোনো কারণে ওই সন্তান কাঁদলে তার জন্য গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হতো। এর বাইরে অন্য কোনো অজুহাতে তাকে মারা হতো কিনা, জানা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানীর ওই ফ্ল্যাটের একজন নিরাপত্তারক্ষী জানায়, সাততলার ওই গৃহকর্ত্রী সামিনা কিছুদিন আগে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন। এরপরই গৃহকর্মী হিসেবে এক তরুণীকে নিয়ে আসা হয়েছিল।



