
মেট্রোরেলের যুগে বাংলাদেশ
রাজধানীবাসীর জন্য বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেলের ফলক উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেলা ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে এক অনুষ্ঠানে এ ট্রেন চলাচলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। আর স্বপ্নের মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। বুধবার উদ্বোধন হচ্ছে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের, যার দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার।
ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন এবং পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময়-সাশ্রয়ী, বিদ্যুচ্চালিত, দূরনিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব অত্যাধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার প্রবর্তন হিসেবে ২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেল একনেকে অনুমোদন লাভ করে।
এমআরটি লাইন-৬-এর প্রাক্কলিত ব্যয় (দ্বিতীয় সংশোধিত) হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪১৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা; যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি ৫২ লাখ এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) সহজ শর্তে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ঋণ দিয়েছে।
ডিপো থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার আদর্শ-গেজ (১ হাজার ৪৩৫ মিলিমিটার) রেলপথে মোট স্টেশন থাকছে ১৭টি। স্টেশনগুলো হচ্ছে—উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, মতিঝিল ও কমলাপুর। বর্তমানে প্রথম পর্যায়ে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত এটি চলবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালানোর চেষ্টায় কাজ চলছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুসরণে এমআরটি লাইন-৬ মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত করার জন্য যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অংশের পরিষেবা যাচাইয়ের কাজও শুরু হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৬ রুটের প্রতিটি স্টেশনে কনকোর্স লেভেল থাকছে। কনকোর্স লেভেলে ওঠার জন্য প্রতিটি স্টেশনে সিঁড়ি, লিফট ও এস্কেলেটর থাকছে। শুধু মেট্রোরেল চলার সময় কনকোর্স লেভেল দিয়ে রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাওয়া যাবে। তবে পেইড জোন এলাকা ও মূল প্ল্যাটফরমে যাওয়া যাবে না। পথচারীরা রাস্তা পারাপারের জন্য এ ব্যবস্থাকে ফুটওভার ব্রিজের অতিরিক্ত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
কমিউনিকেশন বেইজড ট্রেন কন্ট্রোল (সিবিটিসি) সিস্টেমের এ মেট্রোরেলে দুটি ট্রেলার কোচসহ মোট ছয়টি কোচ থাকবে। ভবিষ্যতে আটটি কোচে উন্নীত করা যাবে। ট্রেলার কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৭৪ এবং বাকি চারটি কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৯০ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। সে হিসেবে প্রতিটি মেট্রোরেল ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ফলে ঘণ্টায় ৬০ হাজার এবং দৈনিক ৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। মেট্রোরেলের ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতিবেগ থাকবে ১০০ কিলোমিটার। শুরুতে ১০ মিনিট পরপর চলবে এটি। পর্যায়ক্রমে এক ট্রেনের সঙ্গে অন্য ট্রেনের সময়ের পার্থক্য কমিয়ে আনা হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে তিন মিনিট পরপর মেট্রোরেল চলার কথা।
একক যাত্রার টিকিটের মেয়াদ ১০০ মিনিট: মেট্রোরেলে দুই ধরনের টিকিট থাকবে। একটি দীর্ঘমেয়াদি। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এ টিকিট দিয়ে যাত্রীরা চলাফেরা করতে পারবেন। কিন্তু একবারের জন্য যে টিকিট কাটবেন অর্থাৎ কেউ যদি একবারের জন্য টিকিট কেটে নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে চান তাহলে তিনি এ টিকিট বাইরে প্রদর্শন করতে পারবেন না। এ ধরনের টিকিট কেটে যাত্রার অতিরিক্ত ভ্রমণ করলে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে। টিকিট প্রদর্শন না করলে স্টেশনের গেটের বাইরে যাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে কেউ টিকিট কেটে স্টেশনে ঘোরাফেরা করলে বিপাকে পড়তে পারেন। একক যাত্রার টিকিটগুলোর মেয়াদ থাকবে ১০০ মিনিট। এর মধ্যে স্টেশন ত্যাগ করতে হবে।
এমআরটি পাস: পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় এ ধরনের গণপরিবহন নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত এবং স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা ব্যবহার করেন। দেশেও এ প্রচলন বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তরার যে অংশে মেট্রোরেল ডিপো সেখানে দ্রুত বড় বড় বিল্ডিং উঠছে। নতুন নতুন অফিস ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ নিয়মিত যাত্রীরাই বেশি মেট্রোরেল ব্যবহার করবেন। এ ধরনের যাত্রীদের জন্য থাকবে এমআরটি পাস। প্রতিটি পাস ৪০০ টাকা দিয়ে সংগ্রহ করা যাবে। এর মধ্যে ২০০ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত আর ২০০ টাকা ভাড়া হিসেবে কার্ডে থাকবে। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এ ধরনের পাসে রিচার্জ করা যাবে।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাড়া থাকছে না মেট্রোরেলে: জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য ভাড়া থাকছে না মেট্রোরেলে। পরিচয়পত্র দেখিয়ে মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে পারবেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বাবা এবং মায়ের সঙ্গে থাকা তিন ফুট উচ্চতার বাচ্চাদেরও টিকিট কাটার প্রয়োজন হবে না।
বাসে চড়ে গিয়ে ট্রেন ধরবেন যাত্রীরা, নেমে ফের বাসে: মেট্রোরেল যেখান থেকে ছাড়বে সেখানে এখনও মানুষ খুব একটা বসবাস করে না। উত্তরা, টঙ্গী ও গাজীপুরের মানুষ সাধারণত বাসে এয়ারপোর্ট হয়ে ঢাকার এপাশ-ওপাশ যাতায়াত করে। কিন্তু এখন যানজটের নগরীতে স্বস্তির জন্য মেট্রোরেলকে বেছে নেবেন অনেকে। এজন্য বিআরটিসির ৩০টি বাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি দ্বিতল বাস উত্তরা হাউস বিল্ডিং থেকে যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল স্টেশনে আসবে আর ২০টি বাস মেট্রোরেলের যাত্রী নিয়ে মতিঝিলে যাবে। মতিঝিল অবধি মেট্রোরেল চালুর আগ পর্যন্ত এ ব্যবস্থার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে। আশা করা হচ্ছে আগামী বছর নাগাদ মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হবে।



