
গাজায় সাফল্য পেলেও ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে কেন ব্যর্থ ট্রাম্প
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তির চুক্তি করিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু একই কূটনৈতিক দক্ষতা ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বহু প্রতিশ্রুত বৈঠকও স্থগিত হয়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ নীতিতে স্পষ্ট হচ্ছে এক ধরনের বৈপরীত্য।
গাজায় যুদ্ধবিরতির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছেন ট্রাম্পের কূটনৈতিক দূত স্টিভ উইটকফ। তার মতে, কাতারে থাকা হামাস প্রতিনিধিদের ওপর ইসরায়েলের সামরিক হামলার সিদ্ধান্তই আলোচনার গতি বদলে দেয়। নেতানিয়াহু প্রশাসনের সেই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপে আরব দেশগুলো ক্ষুব্ধ হলেও ট্রাম্পের হাতে আসে চাপ প্রয়োগের নতুন সুযোগ।
ট্রাম্পের দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থনমূলক অবস্থান নিয়ে আছেন। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, পশ্চিম তীরের বসতি বৈধ ঘোষণা, ইরানের বিরুদ্ধে তেলবাহী নিষেধাজ্ঞা— এ সকল পদক্ষেপই তাকে ইসরায়েলি রাজনীতিতে প্রভাবশালী করে তুলেছে। এর ফলাফল হলো– তিনি এমন চাপ প্রয়োগ করতে পেরেছেন যা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও উপেক্ষা করতে পারেননি।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরব নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ট্রাম্পের মিত্রতা বেশ গভীর। এসবকিছুর সমন্বয়েই গাজায় যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু ইউক্রেনের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক জটিল এবং পরস্পরবিরোধী। কখনো পুতিনের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি, কখনো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে চাপ দেয়া, আবার কখনো দুই পক্ষকেই শান্তির আহ্বান— ট্রাম্পকে দেখা গেছে বহুবিধ ভূমিকায়।
নয় মাসের মধ্যে তিনি একাধিকবার সামরিক সহায়তা স্থগিত, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ এবং ইউক্রেনকে ‘অতিরিক্ত নির্ভরশীল’ বলে সমালোচনা করেছেন। এতে মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, মার্কিন অনিশ্চয়তা ইউরোপের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে।
অন্যদিকে, পুতিন ট্রাম্পের ‘ডিলমেকার’ মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। গত বছর কংগ্রেসে যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা পাশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই পুতিন আলাস্কায় শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাবে সম্মতি দেন। এতে সেই আইনও স্থগিত হয়ে পড়ে। একইভাবে, কিয়েভে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি-এয়ার ব্যাটারি পাঠানোর বিষয়ে হোয়াইট হাউজ যখন গুরুত্ব সহকারে ভাবছিল, ঠিক তখনই পুতিন ট্রাম্পকে ফোন করেন এবং বুদাপেস্ট শীর্ষ বৈঠকের বিষয়টি সামনে আসে।
ইউক্রেণের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ ঘটনা প্রবাহের ক্রম লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘আমাদের (ইউক্রেনের) জন্য দূরপাল্লার অস্ত্রের বিষয়টি যখন কিছুটা দূরে সরে গেল, তখন রাশিয়াও প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কূটনীতির প্রতি আগ্রহ হারাল।‘
ট্রাম্প একসময় ইউক্রেন যুদ্ধকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে যুদ্ধ শেষ করা তার প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন প্রমাণিত হচ্ছে। এ স্বীকারোক্তিই ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত কোনো পথও নেই ট্রাম্পের দৃষ্টিসীমায়।
তাছাড়া, পুতিন ও জেলেনস্কি—দু’জনই জানেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সীমা আছে। ফলে তার কূটনীতি এখন ‘চাপের বদলে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি’তে পরিণত হয়েছে।
গাজায় যে ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করেছে, ইউক্রেনে সেখানে প্রয়োজন জোটগত সংহতি—যেটি ট্রাম্পের একার পক্ষে সম্ভব নয়।



