গণমাধ্যমপ্রধান খবরবাংলাদেশ

নীলফামারীতে ‘সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি-প্রতারণা’: ভুয়া নিয়োগপত্রে স্বপ্না হাতিয়েছেন ২৮ লাখ টাকা, নিঃস্ব শিক্ষকের পরিবার

নীলফামারী জেলার স্বপ্না আক্তার স্বর্ণালী শাহ নামে কথিত সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে একই জেলার ডিমলা উপজেলার দিলীপ কুমার রায় নামে এক শিক্ষকের কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা হাতিয়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী দিলীপ কুমার রায় উপজেলার শালহাটি দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্যদিকে স্বপ্না নীলফামারী রিপোর্টার্স ইউনিটি নামে সংগঠনের সভাপতি পদে আছেন বলে পরিচয় দেন।

ভুক্তভোগী দিলীপ রায় ইত্তেফাককে বলেন, স্থানীয় মাহফুজার রহমান মিলন (৪৪) (পেশায় মাদরাসা শিক্ষক) ২০২১ সালে স্বপ্না আক্তারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

দিলীপ জানান, স্বপ্না আক্তার তাকে এই আশ্বাস দেন যে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে- যে কোনো দপ্তরে সরকারি চাকরি নিয়ে দিতে পারেন তিনি। স্বপ্নার এই ফাঁদে পা দিয়ে ২৮ লাখ টাকা খুইয়েছেন ওই স্কুল শিক্ষক।

মূলত দিলীপের দুই মেয়ের চাকরি নিয়ে দেওয়ার চুক্তি করে তিন দফায় মোট ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন স্বপ্না। এ নিয়ে একটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাপে ‘ধার-দেনা’ সংক্রান্ত চুক্তিও করেন স্বপ্না। পৈত্রিক জমি ও শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দুই সন্তানের চাকরি আশায় স্বপ্নার কাছে ওই টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই স্কুল শিক্ষক।

তিনি বলেন, আমি একজন স্কুল শিক্ষক। এভাবে চাকরির জন্য টাকা দিতে প্রথমে আমার মন সায় দেয়নি। পরে বিভিন্নভাবে আমাকে প্ররোচিত করা হয়েছে। শেষ বয়সে দুই সন্তানের কথা ভেবে তাদের ফাঁদে পা দিই আমি। এরপর নিজের জমি বিক্রি করে সেই টাকা স্বপ্নার হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু পরে ভুল বুঝতে পেরেছি।

সেই স্ট্যাম্পের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর স্বপ্না প্রথম ধাপে দিলীপ রায়ের কাছে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন।

দ্বিতীয় ধাপে ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নেন আট লাখ ৫০ হাজার টাকা। এরপর সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে এই শিক্ষকের কাছে নিয়েছেন ১৪ লাখ টাকা।

এ ঘটনার পর যখন দিলীপ রায় স্বপ্নার কাছে তার দুই মেয়ের চাকরির নিয়োগপত্র চায়। তখন কথিত এই সাংবাদিক দিলীপকে দুইটি চাকরির নিয়োগ পত্রের ফটোকপি দেন।

স্বপ্না সেই সময় দিলীপকে আশ্বাস দেন, তিনি তার ছোট মেয়ে দোলনাকে অফিস সহায়ক পদ পাসপোর্ট অধিদপ্তর-মহাখালী ঢাকা অফিসে ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে যোগদান করিয়ে দেবেন।

এ ছাড়া দিলীপ রায়ের আরেক মেয়ে দ্রুপতিকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে (রংপুর জেলা দায়রা জজ কোর্টে) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অফিসে ২০২২ সালের জুন মাসেই চাকরিতে যোগ করিয়ে দেবেন বলে নিশ্চয়তা দেন।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু ২৮ লাখ টাকা হাতিয়েই ক্ষান্ত হননি স্বপ্না। পরে মূল নিয়োগপত্র দেওয়ার নামে স্কুল শিক্ষকের কাছ থেকে আরও দুই লাখ টাকা দাবি করেন। তবে দিলীপকে দেওয়া হয় ভুয়া নিয়োগপত্র।

সেই নিয়োগপত্রের সূত্র ধরেই প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন ওই স্কুল শিক্ষক। ভুয়া নিয়োগপত্রের বিষয়টি দিলীপ স্বপ্নাকে জানান। তবে বিষয়টি ‘দেখছি’ বলেই তিন বছর কাটিয়ে দেন স্বপ্না। এরপর থেকে টালবাহানা শুরু করেন কথিত এই সাংবাদিক। টাকা ফেরত দূরের কথা টাকা নেওয়ার কথাই অস্বীকার করেন তিনি।

এ অবস্থায় নীলফামারী কোর্টে স্বপ্নার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর মামলা দায়ের করেন স্কুল শিক্ষক দিলীপ। মামলার পর এসব বিষয় উঠে আসে পুলিশের তদন্তেও। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রোবায়েত (এসআই) চলতি বছরের ৮ মে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

গোয়েন্দা পুলিশের (এসআই) মোহাম্মদ আব্দুর রোবায়েত ইত্তেফাককে বলেন, তদন্তে স্বপ্নার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে জানতে পেরেছি, স্বপ্না ওই শিক্ষকের কাছ থেকে তিন ধাপে ২৮ লাখ টাকা নিয়েছে। যার সবকটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে। যেখানে সাক্ষী ছিল, স্বপ্নার সাক্ষরও ছিল। আমরা সবকিছুই তদন্ত করেছি।

তিনি ইত্তেফাককে আরও বলেন, এমনকি তিনি চাকরির প্রলোভনে নিয়োগপত্রও দিয়েছেন, সেটাও ভুয়া। মূলত ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার পরপরই ওই শিক্ষক প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। তদন্তের রিপোর্ট ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের (এসআই) মোহাম্মদ আব্দুর রোবায়েত ইত্তেফাককে বলেন, তদন্তে স্বপ্নার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে জানতে পেরেছি, স্বপ্না ওই শিক্ষকের কাছ থেকে তিন ধাপে ২৮ লাখ টাকা নিয়েছে। যার সবকটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে। যেখানে সাক্ষী ছিল, স্বপ্নার সাক্ষরও ছিল। আমরা সবকিছুই তদন্ত করেছি।

তিনি ইত্তেফাককে আরও বলেন, এমনকি তিনি চাকরির প্রলোভনে নিয়োগপত্রও দিয়েছেন, সেটাও ভুয়া। মূলত ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার পরপরই ওই শিক্ষক প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। তদন্তের রিপোর্ট ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, বিষয়টি আমি অবগত নই। সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি আমাকে পাঠান। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগের জন্য স্বপ্না আক্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয়েছে। তবে কল রিসিভ করেননি তিনি। তাই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

উল্লেখ্য সাংবাদিকতার নামে স্বপ্না আক্তার স্বর্ণালি শাহ ও তার দলবলের ‘অপপ্রচার ও চাঁদাবাজিতে’ অতিষ্ঠ হয়ে এর আগে গত ১৬ জুলাই সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন নীলফামারী জেলার লক্ষীচাপ ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, গত ৮ জুলাই স্বপ্না ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে অন্তত তিনজনের কাছে চাঁদাবাজি করেছেন। এই চক্রে আছেন স্বপ্নার স্বামী সোহেল রানাসহ অনেকে। মূলত এ ঘটনার পর থেকে স্বপ্নার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension