প্রধান খবরবাংলাদেশ

পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ৬৭% থেকে কমে মূল্যস্ফীতি হয় ঋণাত্মক

ইয়াহইয়া নকিব ও আরফিন শরিয়ত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ১৩ দিন পর তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক বাংলা’র প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘দেশের সর্বত্র চালের দাম কমেছে’। ২৮ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেশের সর্বত্র চালের দাম আরো কমেছে। পাবনা ও জয়পুরহাটে বুধবার চালের সর্বনিম্ন দাম ছিল প্রতি মণ ৮০ টাকা। রাজধানী ঢাকায়ও গত নয়দিনে বিভিন্ন চালের দাম মণপ্রতি ৪০ থেকে ৭০ টাকা কমেছে। শ্রীমঙ্গলে চালের দাম ১০০ টাকায় নেমেছে। নেত্রকোনায় গত ১০ দিনে চাল মণপ্রতি ৪০ থেকে ১৬০ টাকা কমেছে। চালের দাম কমায় সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে স্বস্তির ভাব। চালের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও কমতে শুরু করেছে। ঢাকার চাল ব্যবসায়ীদের অভিমত, চালের দাম আরো কমবে।’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতিতে আসে আমূল পরিবর্তন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে; দাম কমে খাদ্যশস্য, কাপড়-চোপড় ও শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের। এ সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা একেবারে আড়ালে চলে যান। ওই বছর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রেখে শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে।

এদিকে দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি রেখে ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এর মধ্যে শেষ দুই বছরের প্রায় প্রতি মাসেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে রেকর্ড তৈরি হয়। সর্বশেষ জুলাইয়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ সাধারণ মূল্যস্ফীতি এবং ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ সফল করতে পেরেছে। এ অবস্থায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা জনসাধারণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অবশ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দ্রুতই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যার পর ওইদিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। এর পর থেকে খাদ্যমূল্য ক্রমাগত কমতে থাকে। খাদ্যমূল্য হ্রাসের প্রবণতা দীর্ঘ সময় অব্যাহত থাকে। তৎকালীন প্রকাশিত দুটি জাতীয় দৈনিকের অন্তত পাঁচ মাসের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

১৯৭৫ সালের ২২ আগস্ট দৈনিক বাংলার এক প্রতিবেদনে তৎকালীন শিল্প প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরীর বরাত দিয়ে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের শিল্পে উৎপাদন সন্তোষজনক। সংশ্লিষ্ট করপোরেশনগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে।

পরের দিনের (২৩ আগস্ট) সংবাদপত্রে চালসহ জিনিসপত্রের দাম কমছে বলে জানানো হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সামরিক আইন জারি হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন স্থানে চালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমেছে। পণ্যমূল্যের এ নিম্নমুখী প্রবণতা ক্রেতাসাধারণ বিশেষ করে স্বল্প আয়ের লোকদের মধ্যে স্বস্তি নিয়ে এসেছে।’

প্রতিবেদনে তৎকালীন পণ্যের দাম উল্লেখ করে বলা হয়, ‘মাঝারি মানের চালের দাম আগে ছিল সেরপ্রতি ৫ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ টাকায়। প্রতি সের গম আগে বিক্রি হচ্ছিল সাড়ে ৪ টাকায়। এখন এ দর ১ টাকা ৭৫ পয়সা।’

শুধু নিত্যপণ্য নয়, অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও কমতে শুরু করে। দৈনিক বাংলার ২৯ আগস্টের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘কাপড় ও বেবি ফুডসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম কমছে’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, ‘শুধু চাল নয়; তেল, সাবান, বেবি ফুড, কাপড়সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম রাজধানীতে কমতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আরো কমবে। প্রথম কারণ, অ্যাটাচি কেস ব্যবসায়ী অর্থাৎ, অসাধু ব্যবসায়ীরা গত ক’দিন ধরে একেবারে অদৃশ্য হয়েছে।’

রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারের এক ব্যবসায়ীর ঊদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অ্যাটাচি কেস ব্যবসায়ীরা স্বাধীনতার পর থেকে দ্রব্য সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছিল। এদের না আছে দোকান, না আছে ব্যবসায়িক চরিত্র। সম্বল শুধু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাহায্য, প্যাড আর অ্যাটাচি কেস। এরা অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে প্রচুর পরিমাণ জিনিস পেত আর মজুদ করত। ফলে পণ্য সংকট আরো তীব্র হতো। এরা সময় বুঝে বাজারে মাল ছাড়ত।’

শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ২০১০-১১ অর্থবছরে গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ। সে হিসাবে গত প্রায় দেড় দশকের মধ্যে গত মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ঠেকে ১২ দশমিক ৩ শতাংশে। তারপর এই প্রথম আবার তা সাড়ে ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় গত মাসে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ সম্পর্কে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ভুল মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছিল। দীর্ঘদিন তারা সুদের হারে পরিবর্তন আনেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশাল অংকের ঋণ নিয়েছিল, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। অনেক পরে গিয়ে সরকার কিছু নীতি পরিবর্তন করলেও তা কাজে আসেনি। আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে তারা শুল্ক ছাড় দেয়নি। ৩০ শতাংশ টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছিল, তখন শুল্ক ছাড় দেয়া যেত। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কারণ তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্র ছিল।’

বর্তমান সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হবে। এখনো সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়নি। আর অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

’৭৫-এর পটপরিবর্তনের আগেও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। বিবিএসের তথ্যমতে, ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে দেশের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল ৭৬ দশমিক ৮৯ শতাংশে। এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। পরের বছর সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১৫ দশমিক ৯৯ শতাংশে।

তবে এখনকার পরিস্থিতি আর ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের অনেক তফাত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুটি সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, তখন দুর্ভিক্ষের সময় ছিল। দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। ফলে খাদ্য আমদানি এবং খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তিতে সমস্যা হয়েছিল। আর তখন লাইসেন্স নিয়ে পণ্য আমদানি করতে হতো। এসব লাইসেন্স আবার বিক্রি করা হতো। কয়েকবার হাতবদলের ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যেত। আর পুরো ব্যবস্থাপনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতি হয়েছিল। তাই তখনকার সদ্য স্বাধীন দেশের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য রয়েছে।’

গত জুলাইয়ের রেকর্ড মূল্যস্ফীতির বিষয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মূলত সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। আর মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে না যাওয়ায় অনেকটা প্রকৃত চিত্র পাওয়া গেছে। এটা ১০ শতাংশের বেশি হলেও আগে ঘষামাজা করা হতো। তবে এখন চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট না থাকায় এটা কমে আসবে।’

আগের চেয়ে দাম কমে এলেই মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক হয়ে যায় উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তখনকার মতো হয়তো মূল্যস্ফীতি কমবে না। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ থেকে ৮-১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে মূল্যস্তর ওপরে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অবনমিত থাকবে।’

মূল্যস্তরের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ধরেন কাঁচামরিচের দাম ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা হয়েছিল। এখন যদি তা আবার ২০০ টাকা হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি হয়তো ঋণাত্মক হবে, কিন্তু দাম আগের চেয়ে বেশি থাকল। একই সময়ে মানুষের আয় না বাড়লে ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাই মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।’

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাস্তায় চাঁদাবাজি ও বাজার সিন্ডিকেট অনেকটাই কম দেখা যাচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেট পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল। তবে এখন নতুন বাস্তবতায় তা অনেকটাই কমে এসেছে। এ অবস্থা সরকার কতটা সময় পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে, সেটাই দেখার বিষয় বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সংসদে ৬৬ শতাংশ সদস্য ছিল ব্যবসায়ী। ফলে বাজারে সিন্ডিকেট হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। তবে সরকার এটা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

বাজারে পণ্য সংকটকে এখনকার মূল্যস্ফীতির মূল কারণ বলে মনে করছেন এ কৃষি অর্থনীতিবিদ। তাই কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার এখনো দৃশ্যমান নতুন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংকোচনমূলক রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারকে উৎপাদন বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।’

বণিক বার্তা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension