প্রধান খবরবাংলাদেশ

ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন সোহাগ

ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার তারেক রহমান রবিন অস্ত্র মামলায় আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ চাঁদাবাজির কারণে নয়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পুরান ঢাকায় সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আদালত ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার অস্ত্র মামলায় রবিনকে দুদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। দুদিনের রিমান্ড শেষে রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই মনির হোসেন জীবন। শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

জবানবন্দিতে তিনি জানান, সোহাগ হত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে মহিনসহ অন্যদের সঙ্গে নিহত সোহাগের ভাঙারি ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। যার সূত্র ধরেই সোহাগকে খুন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জবানবন্দিতে তিনি জানান, আসামি মহিনসহ হত্যাকারীরা আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে থেকেই একচেটিয়া ভাঙারি ব্যবসা করে আসছে। সেসময় তারা সবাই হাজী সেলিমের লোক ছিলেন। সরকার পতনের পর মহিনসহ অন্যরা যুবদলে যোগদান করে তাদের একচেটিয়া ব্যবসা ও সিন্ডিকেট ধরে রাখেন। তিনি বলেন, নিহত সোহাগ ভাঙারি ব্যবসার পাশাপাশি আগে থেকেই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর সোহাগ এই ভাঙারি ব্যবসার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। যার ফলে মহিনদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেই সোহাগকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে ৫ থেকে ৬ জন অংশগ্রহণ করে বলেও জবানবন্দিতে জানিয়েছেন অস্ত্র মামলায় আটক তারেক রহমান রবিন।

এদিকে এ ঘটনায় পুলিশ ও র‌্যাব চারজনকে গ্রেফতার করেছে, তাদের মধ্যে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে পাঠান আদালত। তারা হলেন- মাহমুদুল হাসান মহিন ও তারেক রহমান রবিন। এর মধ্যে রবিন রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এছাড়াও শনিবার সোহাগ হত্যা মামলায় গ্রেফতার টিটন গাজীর ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

টিটনের ৭ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর নাসির উদ্দিন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৯ জুলাই বিকাল পৌনে ৬টার দিকে টিটন গাজীসহ অন্যরা মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ী মো. সোহাগকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। লাঠি, হেলমেট, ইট ও সিমেন্টের কংক্রিট দিয়ে মাথায় ও শরীরে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। মৃতদেহের ওপর লাথি মারে এবং লাফিয়ে লাফিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এমন দৃশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে বিভিন্ন সংগঠন এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। এ আসামি মামলার ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।’

শুনানিতে রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর কাইয়ুম হোসেন নয়ন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওতে দেখলাম, পাশবিকভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে ইট, রড, সিমেন্ট, পাথর নিয়ে হামলা করে। আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগের কথা শুনেছি, এবার তা দেখলাম। লাশের ওপর নৃত্য করার দৃশ্যও দেখলাম। তার সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।’

এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টিটন গাজীকে সামনে ডেকে আনেন বিচারক, তার আইনজীবী আছে কি না তা জানতে চান। জবাবে টিটন জানান, তার কোনো আইনজীবী নেই।

এরপর তার কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চাইলে টিটন গাজী আদালতকে বলেন, ‘যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, মনোযোগ সহকারে দেখবেন। আমি কোনো আঘাত বা মারধর করিনি। ভিডিওতে দেখবেন, আমি পেস্ট কালারের গেঞ্জি পরা। আমার এ ঘটনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি কাউকে মারার হুকুম দিইনি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।’

পরে আদালত টিটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।

বিচারক এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার পর টিটন গাজী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, মনির নামের একজন তাকে ফোন দেন। সেই ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা জানা নেই, ভাষ্য টিটনের।

অপরদিকে জবানবন্দি দেওয়ার পর রবিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না। অথচ আমি দোষী, সারা বাংলাদেশের মানুষ এটা জেনে গেছে।’

তার কাছ থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্বীকার করে রবিন বলেন, ৮ দিন পর আমার পর্তুগালের ফ্লাইট, বিদেশ যাওয়ার জন্য তার ২২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের কারও সঙ্গে তার ‘সম্পর্ক নেই’ জানিয়ে রবিন বলেন, ‘আমি ফাইসা গেছি। সন্দেহের কারণে আমাকে গ্রেফতার করেছে। আমার জীবনটা শেষ। আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। আর কিছু বলতে চাই না।’

বুধবার বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে প্রকাশ্যে কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয় ভাঙারি ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে। এরপর এ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে এ ঘটনায় নিহতের বড় বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। আর পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র মামলা করে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension